- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রস্তাবনা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল বাঙালির আত্মত্যাগের এক মহাকাব্য ছিল না, এটি ছিল এক সুসংগঠিত সামরিক প্রতিরোধের ইতিহাস। সমগ্র বাংলাদেশকে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল, যার প্রতিটি ছিল অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত ও ঘামের সাক্ষী। এই সেক্টরগুলো একেকটি রণক্ষেত্রের মতো কাজ করেছে, যেখানে মুক্তিপাগল বাঙালিরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য অসম যুদ্ধ চালিয়েছিল। প্রতিটি সেক্টরের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সামরিক কৌশল এবং বীরত্বপূর্ণ কাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ১১ই জুলাই অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সামরিক সেক্টরে বিভক্ত করে। প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। নিচে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১। সেক্টর ১: এই সেক্টরের আওতায় ছিল চট্টগ্রাম জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ফেনী নদী পর্যন্ত নোয়াখালী জেলার পূর্ব অংশ। এর সদর দপ্তর ছিল ভারতের হরিনায়। প্রথমদিকে এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, পরবর্তীতে মেজর রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সেক্টরের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটি সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এখানে নৌপথে এবং স্থলপথে পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল। এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রধানত পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পথ এবং ঘন জঙ্গল ব্যবহার করে গেরিলা আক্রমণ চালাতেন। চট্টগ্রাম বন্দর এই সেক্টরের অধীনে থাকায় এর সামরিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মুক্তিযোদ্ধারা এখানে পাকিস্তানি বাহিনীর সরবরাহ লাইন ব্যাহত করার জন্য বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করতেন। এই সেক্টরের অন্তর্গত রামগড়, ফেনী, এবং শুভপুর ছিল গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র লড়াই হয়েছিল।
২। সেক্টর ১১: এই সেক্টরের আওতাধীন ছিল টাঙ্গাইল জেলা, ময়মনসিংহ জেলা, রংপুর জেলার উত্তরাংশ (বালিজুরি, কিশামত বালিজুরি) এবং কুড়িগ্রাম জেলার অংশবিশেষ। এর সদর দপ্তর ছিল ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু তাহের, এবং পরবর্তীতে স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ খান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেক্টর ১১ এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর ‘কাদেরিয়া বাহিনী’, যা টাঙ্গাইলের বাঘা সিদ্দিকী (কাদের সিদ্দিকী) দ্বারা পরিচালিত হতো। এই বাহিনী গেরিলা যুদ্ধে অত্যন্ত পারদর্শী ছিল এবং তাদের পরিচালিত অপারেশনগুলো পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের ভাওয়াল গড় ও মধুপুর গড় এলাকার জঙ্গলগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত। এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রধানত যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করা, পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এই সেক্টরের যুদ্ধ কৌশল ছিল মূলত হিট অ্যান্ড রান (hit and run) পদ্ধতি অবলম্বন করা এবং শত্রুকে সর্বক্ষণ চাপে রাখা।
উপসংহার: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এই দুটি সেক্টর, সেক্টর ১ এবং সেক্টর ১১, সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। প্রতিটি সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহস এবং দেশপ্রেম নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এই সেক্টরগুলোর সুসংগঠিত যুদ্ধ কৌশল এবং বীরত্বপূর্ণ অভিযানই বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। প্রতিটি সেক্টরই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক অঞ্চল বিভাজন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ১১ই জুলাই অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার) সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে। এই বিভাজন মূলত যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধা এবং সামরিক কৌশলের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। প্রতিটি সেক্টরই ছিল এক একটি স্বতন্ত্র যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিটি সেক্টরে গড়ে প্রায় ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিল, যাদের মধ্যে নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেক্টর ১ ছিল প্রধানত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত, যেখানে মেজর জিয়াউর রহমান ও মেজর রফিকুল ইসলাম নেতৃত্ব দেন। সেক্টর ১১ ছিল ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত, যার নেতৃত্ব দেন মেজর আবু তাহের ও স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ খান। এই সেক্টরগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

