- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রারম্ভ: প্রাচীন খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিক সেন্ট অগাস্টিন (St. Augustine) তাঁর ‘ঈশ্বরের নগরী’ (City of God) গ্রন্থে ন্যায়ধর্ম ও শান্তির ধারণা নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন। তাঁর চিন্তাভাবনা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসকেই প্রভাবিত করেনি, বরং পশ্চিমা রাজনৈতিক দর্শনেও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। অগাস্টিন মনে করতেন যে, প্রকৃত ন্যায়বিচার ও শান্তি কেবলমাত্র ঈশ্বরের ইচ্ছার মাধ্যমে সম্ভব। তাঁর মতে, পার্থিব রাষ্ট্র যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন, তা ঐশ্বরিক পরিকল্পনারই এক অংশ।
সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়ধর্ম (Justice) এবং শান্তিতত্ত্ব (Peace) একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর মতে, ন্যায়বিচার হলো এমন এক অবস্থা যেখানে প্রতিটি সত্তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়। এই প্রাপ্য মর্যাদা নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা ঈশ্বরের হাতে। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্র তখনই ন্যায়পূর্ণ হতে পারে, যখন সেখানে ঈশ্বরকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয় এবং মানুষ ঈশ্বরের আইন মেনে চলে। অগাস্টিনের মতে, ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা এবং আনুগত্যই হলো প্রকৃত ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি। যদি কোনো রাষ্ট্রীয় আইন ঐশ্বরিক আইনের বিরোধী হয়, তাহলে তা ন্যায়পূর্ণ হতে পারে না। তাঁর কাছে, পার্থিব আইনের বৈধতা নির্ভর করে তার ঐশ্বরিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতির ওপর।
অগাস্টিনের শান্তিতত্ত্বও এই একই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি শান্তিকে কেবল যুদ্ধ বা সংঘাতের অনুপস্থিতি হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে ‘tranquillitas ordinis’ বা ‘শৃঙ্খলার শান্তি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এই শান্তি হলো এমন এক অবস্থা, যেখানে সবকিছুর নিজস্ব স্থান ও মর্যাদা রয়েছে এবং সবকিছুই তার নিজস্ব নিয়মানুসারে পরিচালিত হয়। একজন ব্যক্তি তখনই শান্তি খুঁজে পায়, যখন তার আত্মা ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়। একটি পরিবারে শান্তি আসে, যখন সদস্যরা তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। একইভাবে, একটি রাষ্ট্রে শান্তি আসে, যখন এর নাগরিকরা ন্যায়বিচারের অধীনে বসবাস করে। এই শান্তি হলো ঈশ্বরের দেওয়া এক উপহার।
অগাস্টিন আরও বলেছেন যে, পার্থিব জীবনে সম্পূর্ণ শান্তি অর্জন করা সম্ভব নয়, কারণ মানুষের মধ্যে পাপ ও মন্দ প্রবৃত্তি বিদ্যমান। তবে, পার্থিব রাষ্ট্রগুলোর উচিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, যাতে তারা ঐশ্বরিক ন্যায় ও শান্তির কাছাকাছি যেতে পারে। তিনি ‘ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ’ (Just War) তত্ত্বের একটি রূপরেখাও দিয়েছেন, যেখানে তিনি বলেন যে, কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, যেমন—অন্যের ওপর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করা বা অন্যায়ের প্রতিরোধ করার জন্য যুদ্ধ করা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে। তবে, এই যুদ্ধ অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্যে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজার শেষ উপায় হিসেবে পরিচালিত হতে হবে। এই তত্ত্বে তিনি যুদ্ধের কারণ, যুদ্ধের সময় অনুসরণীয় নৈতিকতা এবং শান্তির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।
উপসংহার: সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়ধর্ম ও শান্তিতত্ত্ব আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন যে, ন্যায়বিচার ও শান্তি কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর ফল নয়, বরং তা মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর দর্শন অনুযায়ী, প্রকৃত শান্তি ও ন্যায়বিচার অর্জনের জন্য মানুষের উচিত ঈশ্বরের প্রতি মনোনিবেশ করা এবং ঐশ্বরিক আইন মেনে চলা।
সেন্ট অগাস্টিন তাঁর ‘City of God’ গ্রন্থে ন্যায়বিচার ও শান্তিকে ঐশ্বরিক বিধানের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সেন্ট অগাস্টিন (৩৫৪-৪৩০ খ্রিস্টাব্দ) রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সময়কাল প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর ‘City of God’ বইটি ৪১৩ থেকে ৪২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লেখা হয়েছিল, যা রোমের পতনের (৪১০ খ্রিস্টাব্দ) প্রতিক্রিয়ায় রচিত। এই গ্রন্থে তিনি পার্থিব রাষ্ট্রকে (City of Man) ঈশ্বরের নগরী (City of God) থেকে আলাদা করেন। তাঁর এই দ্বৈতবাদ মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

