- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: উৎপাদন বিধি বা Law of Production হলো অর্থনীতির একটি মৌলিক ধারণা, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান বা ফার্ম বিভিন্ন উপকরণ (যেমন: শ্রম, ভূমি, পুঁজি) ব্যবহার করে পণ্য বা সেবা উৎপাদন করে। এটি উৎপাদনের দক্ষতা, উপকরণ পরিবর্তনের ফলে উৎপাদনের পরিমাণে কী প্রভাব পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করে। সহজ কথায়, এটি দেখায় যে কীভাবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সর্বাধিক উৎপাদন অর্জন করা যায়।
শাব্দিক অর্থ: উৎপাদন বিধি বলতে সাধারণত উপকরণ এবং উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে সম্পর্ক বোঝানো হয়। ইংরেজিতে এটিকে ‘Law of Production’ বা ‘Production Function’ বলা হয়। এটি মূলত একটি গাণিতিক বা ধারণাগত সম্পর্ক যা ইনপুট (উপকরণ) এবং আউটপুট (উৎপাদিত পণ্য) এর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
উৎপাদন বিধি হলো একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব যা ব্যাখ্যা করে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার করে কত পরিমাণ পণ্য বা সেবা উৎপাদন করা সম্ভব। এটি মূলত ফার্মের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করে। উৎপাদন বিধিতে উৎপাদনকে একটি ফাংশন হিসেবে দেখা হয়, যেখানে উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ নির্ভর করে ব্যবহৃত উপকরণগুলোর পরিমাণের ওপর। এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা এবং দক্ষতা পরিমাপ করতে সাহায্য করে।
গবেষকগণের মধ্যে সবাই উৎপাদন বিধির সরাসরি সংজ্ঞা দেননি। যারা সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো:
১। কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কস উৎপাদন সম্পর্ক (Relations of Production) এবং উৎপাদন পদ্ধতি (Modes of Production) নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, উৎপাদন বিধি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে।
২। স্যামুয়েলসন (Paul A. Samuelson): পল স্যামুয়েলসন এবং উইলিয়াম নর্ডহাউস তাদের বিখ্যাত বই “Economics” এ উৎপাদন ফাংশনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে: “উৎপাদন ফাংশন হলো একটি গাণিতিক সম্পর্ক যা সর্বোচ্চ পরিমাণ আউটপুট দেখায় যা উপকরণসমূহের প্রদত্ত সেট থেকে উৎপাদন করা সম্ভব।”
৩। কুরানো (Cournot): “উৎপাদন বিধি হলো সেই নিয়ম যা নির্দেশ করে কীভাবে একটি ফার্ম তার উপকরণের পরিমাণ পরিবর্তন করে পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে পারে।” (The law of production is the rule that indicates how a firm can increase the production of goods by changing the quantity of its inputs.)
৪। চেম্বারলিন (Edward Chamberlin): “উৎপাদন বিধি একটি প্রযুক্তিগত সম্পর্ক যা উপকরণ এবং উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।” (The law of production is a technical relationship that establishes a connection between inputs and outputs.)
৫। অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith): তিনি সরাসরি সংজ্ঞা না দিলেও শ্রম বিভাজন (Division of Labour) তত্ত্বের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে কীভাবে শ্রমকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা যায়। (He did not give a direct definition, but through his theory of the Division of Labour, he showed how productivity can be increased by properly using labor.)
৬। প্রফেসর বেন্ডহামের সংজ্ঞা: বেন্ডহামের মতে, উৎপাদন বিধি হলো সেই সূত্র, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি বা একাধিক পরিবর্তনশীল উপাদানের সঙ্গে স্থির উপাদানের সংমিশ্রণের মাধ্যমে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
৭্। প্রফেসর ক্যাসেলের সংজ্ঞা: ক্যাসেল বলেছেন যে, উৎপাদন বিধি হলো সেই নীতি, যা কোনো পণ্যের উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে। এই নীতি অনুসারে, প্রতিটি উপকরণ তার নিজস্ব অনুপাত অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়।
৮। প্রফেসর স্মিথের সংজ্ঞা: স্মিথ উৎপাদন বিধিকে এমন একটি নিয়ম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা নির্দিষ্ট উপকরণ ব্যবহার করে একটি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ উৎপাদন করতে পারে। এটি বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের কার্যকর ব্যবহারের ওপর জোর দেয়।
৯। অর্থনীতিবিদ পি. এন. চৌধুরীর সংজ্ঞা: উৎপাদন বিধি হলো সেই প্রযুক্তিগত ও কার্যকরী সম্পর্ক যা উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ বা Factor of Production (যেমন- ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন) এবং উৎপাদনের পরিমাণের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। এটি নির্ধারণ করে যে উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপকরণসমূহকে কী অনুপাতে ও কীভাবে সংমিশ্রণ করে সর্বনিম্ন খরচে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যেতে পারে।
১০। প্রামাণ্য অর্থনৈতিক পরিভাষা অনুযায়ী সংজ্ঞা: উৎপাদন বিধি বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি ফার্ম বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা ব্যবহৃত উৎপাদনের উপকরণগুলোর পরিমাণ এবং সে উপকরণ থেকে প্রাপ্ত মোট উৎপাদনের পরিমাণের মধ্যকার ভৌত সম্পর্ককে। এই সম্পর্কটি একটি গাণিতিক সমীকরণ বা ফাংশনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, যেমন Q = f(L, K), যেখানে Q হলো উৎপাদন, L হলো শ্রম এবং K হলো মূলধন।
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি যে, উৎপাদন বিধি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক সূত্র বা নিয়ম যা দেখায় কীভাবে বিভিন্ন উপকরণ (যেমন: শ্রম, পুঁজি, ভূমি) ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ পণ্য বা সেবা উৎপাদন করা সম্ভব। এটি আসলে উপকরণ এবং উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে একটি কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করে, যা একটি ফার্মের দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতা পরিমাপ করতে সাহায্য করে।
উপসংহার: উৎপাদন বিধি হলো অর্থনীতির এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যা কেবল তত্ত্বীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাস্তব জীবনে প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সর্বাধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এই বিধি ব্যবহার করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ এবং লাভজনক করতে পারে। এটি কেবল উৎপাদনের পরিমাণই নয়, বরং উপকরণের সঠিক ব্যবহার এবং অপচয় রোধেও দিকনির্দেশনা দেয়।
উৎপাদন বিধি হলো উপকরণের পরিমাণ ও উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণের মধ্যে বিদ্যমান প্রযুক্তিগত সম্পর্ক।
উৎপাদন বিধির ধারণাটি ১৭০০ শতকে ফরাসি অর্থনীতিবিদ তুর্গো এবং ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের হাত ধরে বিকাশ লাভ করে। ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা (Law of Diminishing Marginal Returns) এর ধারণাটি ১৭৬৭ সালে তুর্গো উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে এই ধারণাটি বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ১৯৪৫ সালের পর থেকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মডেলে উৎপাদন বিধিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

