- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: খাদ্য মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। দেশের সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য মজুত, ভর্তুকি, সামাজিক সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারের গৃহীত কর্মসূচির বর্ণনা:
১। জাতীয় খাদ্যনীতি: খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি এবং ২০২১–২০৩০ মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে খাদ্যের পর্যাপ্ততা, মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি এবং পুষ্টিমান উন্নয়নের উদ্যোগ সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হয়েছে।
২। উৎপাদন বৃদ্ধি: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণে সরকার ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ ও সবজির উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। উন্নত কৃষিপ্রযুক্তি, ফসলের বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশীয় খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী করা সম্ভব হয়।
৩। কৃষি প্রণোদনা: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহ দিতে সরকার নিয়মিত কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনা করে। এর আওতায় বিনামূল্যে বা সহায়তামূল্যে বীজ, সার, চারা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমে এবং খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ে।
৪। উন্নত বীজ: অধিক ফলন নিশ্চিত করতে সরকার কৃষকদের মাঝে উন্নত, উচ্চফলনশীল ও উপযোগী জাতের বীজ সরবরাহ করে। ধান, পেঁয়াজ, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের উন্নত বীজ ব্যবহারে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে একই জমি থেকে বেশি খাদ্য উৎপাদন করে জাতীয় খাদ্যচাহিদা পূরণ সহজ হয়।
৫। সার সহায়তা: কৃষি উৎপাদনের খরচ কমিয়ে রাখতে সরকার বিভিন্ন ফসলের জন্য সার সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এতে সময়মতো চাষাবাদ সম্ভব হয় এবং খাদ্যশস্যের উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
৬। সেচ সুবিধা: কৃষিকে শুধু বৃষ্টিনির্ভর না রেখে সারা বছর উৎপাদন সচল রাখতে সরকার সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেয়। ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবহার, সেচ প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং কৃষকের পানি পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে একাধিক মৌসুমে ফসল উৎপাদনের পরিবেশ তৈরি করা হয়।
৭। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ: দ্রুত ও কম খরচে কৃষিকাজ সম্পন্ন করতে সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে উৎসাহিত করছে। আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, ফসল কাটা ও সংরক্ষণ সহজ হয়। এতে শ্রম ও সময় সাশ্রয় হয়, ফসলের অপচয় কমে এবং খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
৮। সরকারি সংগ্রহ: সরকার নির্দিষ্ট মৌসুমে কৃষক ও চালকলের কাছ থেকে ধান, চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে। সরকারি সংগ্রহ খাদ্যের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত শস্য বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করে। অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমেও কৃষকের কাছ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে।
৯। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত: কৃষক যেন উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত দাম পান, সেজন্য সরকারি খাদ্য সংগ্রহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যমূল্যের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কৃষকের কাছ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করলে তারা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পান। এতে কৃষিকাজে আগ্রহ বজায় থাকে এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনও উৎসাহিত হয়।
১০। খাদ্য মজুত: দুর্যোগ, সংকট বা উৎপাদন ঘাটতির সময় খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সরকারি গুদাম ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা পরিচালনা করে। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত থাকলে জরুরি সময়ে দ্রুত খাদ্য বিতরণ করা সম্ভব হয়। ফলে হঠাৎ সৃষ্ট খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং বাজারে সরবরাহ বজায় রাখা সহজ হয়।
১১। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি: নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এর মাধ্যমে নির্বাচিত দরিদ্র পরিবারকে ভর্তুকিমূল্যে খাদ্যশস্য পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এতে বাজারমূল্য বেশি থাকলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী তুলনামূলক কম খরচে প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং খাদ্যসংকটের ঝুঁকি কমে।
১২। ওএমএস কার্যক্রম: সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে খাদ্যশস্য পৌঁছে দিতে সরকার খোলা বাজারে বিক্রয় বা ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনা করে। নির্ধারিত কেন্দ্র বা ডিলারের মাধ্যমে কম দামে চাল ও আটা বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এতে বাজারে মূল্যচাপ কমানো এবং নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি সহজ হয়।
১৩। দুর্যোগ সহায়তা: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সরকার জরুরি খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করে। সরকারি মজুত থেকে দ্রুত খাদ্য সরবরাহ ও বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়। এতে দুর্যোগকালীন ক্ষুধা ও খাদ্যাভাব কমিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা সহজ হয়।
১৪। সামাজিক সহায়তা: দরিদ্র, অসহায় নারী, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। মা ও শিশু সহায়তা এবং ভালনারেবল উইমেন বেনিফিটের মতো কর্মসূচি পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়ে খাদ্যপ্রাপ্তি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় সহায়তা করে।
১৫। পুষ্টি নিরাপত্তা: শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য নয়, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাকেও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। শস্য বহুমুখীকরণ, পুষ্টিকর ফসল উৎপাদন এবং নিরাপদ কৃষিপণ্য সরবরাহের মাধ্যমে মানুষের পুষ্টিমান উন্নত করার চেষ্টা চলছে। এতে অপুষ্টি কমানোর পাশাপাশি সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে।
১৬। সংরক্ষণ ব্যবস্থা: খাদ্যশস্যের অপচয় কমিয়ে দীর্ঘসময় মান বজায় রাখতে সরকার আধুনিক গুদাম, সংরক্ষণ সুবিধা ও বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করছে। চলমান প্রকল্পে সরকারি খাদ্য সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বিতরণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে সংকটকালেও প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব হয়।
১৭। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা: খাদ্যশস্য সংগ্রহে স্বচ্ছতা ও গতি বাড়াতে সরকার অনলাইনভিত্তিক খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা চালু করেছে। কৃষক ঘরে বসে নিবন্ধন ও ধান-চাল বিক্রির আবেদন করতে পারেন এবং এসএমএসে তথ্য পান। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমিয়ে কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ সহজ হয়।
উপসংহার: বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, মজুত, বিতরণ ও পুষ্টি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও মূল্যবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর্মসূচিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন আরও জোরদার করা প্রয়োজন।