- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- জাতীয় নিরাপত্তা বলতে কী বুঝ?
Or, জাতীয় নিরাপত্তা কি?
Or, জাতীয় নিরাপত্তা কাকে বলে?
Or, জাতীয় নিরাপত্তার সজ্ঞা দাও।
উত্তর::ভূমিকা: একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আধুনিক বিশ্বে জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, সামাজিক ঐক্য ও নাগরিকদের কল্যাণের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। একটি শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা রাষ্ট্রের শান্তি, উন্নয়ন ও অস্তিত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জাতীয় নিরাপত্তার পরিচয়:-
জাতীয় নিরাপত্তা হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জনগণের জীবন ও সম্পদকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক হুমকি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। প্রচলিতভাবে জাতীয় নিরাপত্তা বলতে সামরিক আক্রমণ প্রতিরোধকে বোঝানো হলেও বর্তমানে এর পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। এখন সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত সমস্যা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকেও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জাতীয় নিরাপত্তার শাব্দিক অর্থ:- জাতীয় নিরাপত্তা শব্দটি ইংরেজি “National Security” শব্দের বাংলা রূপ। “National” অর্থ হলো জাতি বা রাষ্ট্র সম্পর্কিত এবং “Security” অর্থ হলো নিরাপত্তা বা সুরক্ষা। অর্থাৎ কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের নিরাপদ অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থাকে জাতীয় নিরাপত্তা বলা হয়।
১। ওয়াল্টার লিপম্যান (Walter Lippmann): “A nation has security when it does not have to sacrifice its legitimate interests to avoid war and is able, if challenged, to maintain them by war.” (একটি রাষ্ট্র তখন নিরাপদ থাকে, যখন যুদ্ধ এড়ানোর জন্য তাকে তার বৈধ স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয় না এবং প্রয়োজন হলে যুদ্ধের মাধ্যমে তা রক্ষা করতে সক্ষম হয়।)
২। হ্যারল্ড ব্রাউন (Harold Brown): “National security is the ability to preserve the nation’s physical integrity and territory; to maintain its economic relations with the rest of the world on reasonable terms.” (জাতীয় নিরাপত্তা হলো একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও অস্তিত্ব রক্ষা করার এবং বিশ্বের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা।)
৩। আর্নল্ড উলফার্স (Arnold Wolfers): “Security, in an objective sense, measures the absence of threats to acquired values, and in a subjective sense, the absence of fear that such values will be attacked.” (নিরাপত্তা বস্তুনিষ্ঠ অর্থে অর্জিত মূল্যবোধের ওপর হুমকির অনুপস্থিতি এবং বিষয়গত অর্থে সেই মূল্যবোধ আক্রান্ত হওয়ার ভয় থেকে মুক্তিকে বোঝায়।)
৪। ব্যারি বুজান (Barry Buzan): “Security is about survival.” (নিরাপত্তা মূলত টিকে থাকা বা অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।) বুজানের মতে, রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজ ও ব্যক্তির নিরাপত্তাও জাতীয় নিরাপত্তার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
৫। হ্যান্স মরগেনথাউ (Hans Morgenthau): “National security must be understood as the integrity of the national territory and its institutions.” (জাতীয় নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অখণ্ডতা হিসেবে বুঝতে হবে।)
৬। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): “Security is a nation’s ability to protect its internal values from external threats.” (নিরাপত্তা হলো একটি রাষ্ট্রের এমন সক্ষমতা, যার মাধ্যমে সে বাহ্যিক হুমকি থেকে তার অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ রক্ষা করতে পারে।)
৭। রিচার্ড উলম্যান (Richard Ullman): “A threat to national security is an action or sequence of events that threatens drastically and over a relatively brief span of time to degrade the quality of life for the inhabitants of a state.” (জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হলো এমন কোনো ঘটনা বা কার্যক্রম, যা অল্প সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রের জনগণের জীবনযাত্রার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, জাতীয় নিরাপত্তা হলো এমন একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জনগণের জীবন ও অধিকারকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সব ধরনের হুমকি থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার: জাতীয় নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও উন্নয়নের ভিত্তি। বর্তমান যুগে শুধু সামরিক শক্তি নয়, বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও জনগণের কল্যাণও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য কার্যকর জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরিহার্য।