- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: অর্থনীতিতে দীর্ঘকালীন গড় ব্যায় রেখা (LRAC) কেন ‘L’ আকৃতির হয়, তা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো একটি ফার্মের দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন পরিকল্পনার একটি মৌলিক চিত্র। এই রেখাটি দেখায়, কীভাবে একটি ফার্ম বড় হতে থাকলে তার গড় উৎপাদন ব্যয় কমে যায় এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর পর প্রায় স্থিতিশীল হয়ে আসে। এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করে যে, কেন বড় বড় সংস্থাগুলো প্রায়শই ছোট সংস্থাগুলোর চেয়ে বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়।
১।উৎপাদনের দক্ষতা বৃদ্ধি: দীর্ঘকালে একটি ফার্ম তার উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তুলতে পারে। যেমন, প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত মেশিনারি স্থাপন, এবং কর্মীদের বিশেষীকরণ বৃদ্ধি করে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়। যখন একটি ফার্ম তার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায়, তখন সে তার সম্পদকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে, ফলে প্রতিটি একক পণ্যের পেছনে গড় ব্যয় কমে আসে। এই কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে গড় ব্যায় রেখা দ্রুত নিচে নামতে থাকে।
২।ব্যাপক উৎপাদন বা ইকোনোমিস অব স্কেল: ইকোনোমিস অব স্কেল মানে হলো, যখন একটি ফার্ম তার উৎপাদন বাড়ায়, তখন তার গড় ব্যায় কমে যায়। এটি ঘটে কারণ, বড় আকারের উৎপাদনের ফলে কাঁচামাল কেনা, বিপণন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় কম হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বড় ফার্ম একবারে প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল কিনে সরবরাহকারীর কাছ থেকে ছাড় পেতে পারে, যা ছোট ফার্মের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি গড় ব্যায় রেখার নিম্নমুখী অংশের প্রধান কারণ।
৩।অবিরাম উন্নতি: একটি ফার্ম যত বেশি সময় ধরে কাজ করে, তত বেশি তারা তাদের কাজের পদ্ধতিকে উন্নত করতে পারে। কর্মীরা অভিজ্ঞ হয়, নতুন ও কার্যকর কৌশল আবিষ্কৃত হয়, এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর উপায় বের হয়। এই অবিরাম উন্নতির প্রক্রিয়াটি গড় ব্যায়কে ক্রমাগতভাবে কমিয়ে আনতে সাহায্য করে, বিশেষ করে যখন উৎপাদন বাড়ানো হয়। এর ফলে রেখাটি ধীরে ধীরে আরও সমতল হতে থাকে।
৪।প্রযুক্তিগত অগ্রগতি: দীর্ঘমেয়াদে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একটি ফার্মের উৎপাদন ব্যয় কমাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন ও উন্নত মেশিন বা সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে একটি ফার্ম কম সময়ে বেশি পণ্য উৎপাদন করতে পারে, যা প্রতি একক পণ্যের খরচ কমিয়ে আনে। এই প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো বড় ফার্মগুলো সহজেই কাজে লাগাতে পারে, যা ছোট ফার্মগুলোর পক্ষে কঠিন। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার গড় ব্যয় রেখার নিম্নমুখী প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে।
৫।বিশেষীকরণ ও শ্রম বিভাজন: যখন একটি ফার্ম বড় হয়, তখন কর্মীদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া সহজ হয়। প্রত্যেক কর্মী তার নির্দিষ্ট কাজটিতে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে, যা তাদের দক্ষতা বাড়ায় এবং সময় ও সম্পদ সাশ্রয় করে। এই বিশেষীকরণের ফলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও মসৃণ ও কার্যকর হয়, যা প্রতি একক পণ্যের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনে। এটি গড় ব্যায় রেখার নিম্নমুখী অংশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
৬।যৌথ ক্রয় ক্ষমতা: বড় ফার্মগুলো একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল এবং অন্যান্য সরঞ্জাম কিনতে পারে। এই ব্যাপক ক্রয়ের কারণে তারা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিশেষ ছাড় বা কম দাম পায়। এই যৌথ ক্রয় ক্ষমতা ছোট ফার্মগুলোর তুলনায় তাদের গড় ব্যয় অনেক কমিয়ে দেয়, যা তাদেরকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয়। এর ফলে গড় ব্যায় রেখা আরও নিচে নেমে আসে।
৭।প্রশাসনিক দক্ষতা: যখন একটি ফার্ম বড় হয়, তখন তারা প্রশাসনিক কাজেও দক্ষতা অর্জন করে। একটি দক্ষ ব্যবস্থাপনা দল, উন্নত পরিকল্পনা এবং কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা সামগ্রিক খরচ কমাতে সাহায্য করে। এই প্রশাসনিক দক্ষতা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সব স্তরেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা গড় ব্যয়কে কমিয়ে আনে এবং রেখাটিকে নিম্নমুখী করে তোলে।
৮।অর্থনৈতিক লাভ: বড় আকারের ফার্মগুলো প্রায়ই বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করে, যেমন কম সুদে ঋণ পাওয়া বা সহজে পুঁজি সংগ্রহ করা। ব্যাংক এবং বিনিয়োগকারীরা বড় ফার্মগুলোকে বেশি নিরাপদ মনে করে, যা তাদের জন্য অর্থসংস্থান সহজ করে তোলে। এই আর্থিক সুবিধাগুলো তাদের উৎপাদন খরচ কমাতে সাহায্য করে।
৯।পণ্যের নকশার উন্নতি: দীর্ঘমেয়াদে একটি ফার্ম তার পণ্যের নকশা উন্নত করতে পারে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সহজ এবং কম ব্যয়বহুল করে তোলে। পণ্যের নকশার সামান্য পরিবর্তনও ব্যাপক উৎপাদনে বড় ধরনের খরচ সাশ্রয় করতে পারে। এই ধরনের উন্নতিগুলো গড় ব্যায়কে আরও কমিয়ে দেয়।
১০।পরিমাপের সীমাবদ্ধতা: কিছু ক্ষেত্রে, একটি ফার্মের উৎপাদন যতই বাড়ুক না কেন, কিছু ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে। যেমন, একটি বড় কারখানার জন্য নির্ধারিত ভাড়ার খরচ উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিটি একক পণ্যের জন্য কমে আসে। এটিও গড় ব্যায় রেখার নিম্নমুখী প্রবণতার একটি কারণ।
১১।অবস্থানগত সুবিধা: একটি ফার্ম তার কারখানার জন্য এমন একটি অবস্থান বেছে নিতে পারে যেখানে কাঁচামাল বা বাজারের কাছাকাছি হওয়ায় পরিবহন খরচ কম হয়। এই ধরনের কৌশলগত অবস্থানগত সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে গড় ব্যয়কে কমিয়ে আনে।
১২।পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ: যখন একটি ফার্ম একই ধরনের কাজ বারবার করে, তখন কর্মীরা আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে কাজ করতে শেখে। এই পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়াটি শেখার সুযোগ দেয়, যা উৎপাদন খরচ কমাতে সাহায্য করে এবং গড় ব্যয় রেখা ধীরে ধীরে সমতল হতে থাকে।
১৩।সীমিত প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি: যদিও একটি ফার্মের উৎপাদন বাড়লে প্রশাসনিক ব্যয় কিছুটা বাড়ে, তবে তা উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম হয়। ফলে, প্রতি একক পণ্যের উপর প্রশাসনিক ব্যয় কমে আসে।
১৪।নির্দিষ্ট ব্যয়ের প্রভাব: কিছু ব্যয় যেমন গবেষণা ও উন্নয়ন বা বিজ্ঞাপনের খরচ উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি একক পণ্যের জন্য কমে যায়। এই নির্দিষ্ট ব্যয়গুলো বেশি পরিমাণে পণ্যের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, যা গড় ব্যয়কে কমিয়ে দেয়।
১৫।বাজারের ক্ষমতা: বড় ফার্মগুলো প্রায়শই বাজারে তাদের প্রভাব ব্যবহার করে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কম দামে কাঁচামাল কিনতে পারে। এই বাজারের ক্ষমতা তাদেরকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয় এবং গড় ব্যয়কে কমিয়ে দেয়।
১৬।দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিসমূহ: দীর্ঘমেয়াদী কাঁচামাল সরবরাহ বা অন্যান্য পরিষেবাগুলোর জন্য চুক্তিসম্পাদন করে একটি ফার্ম মূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারে এবং অপ্রত্যাশিত ব্যয় এড়াতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিগুলো গড় ব্যয়কে কমিয়ে আনে।
১৭।সীমিত আকারের অপচয়: যখন একটি ফার্ম খুব বড় হয়, তখন কিছু অপচয় বা অদক্ষতা দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত এই অপচয়গুলো উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় কম হয়। এর ফলে, গড় ব্যায় রেখা একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর পর আর নিচে না নেমে প্রায় স্থিতিশীল থাকে, যা রেখাটির ‘L’ আকৃতির সমতল অংশটি তৈরি করে।
১৮।সর্বনিম্ন দক্ষ স্কেল বা MES: একটি নির্দিষ্ট আকারের পরে, ফার্মটি তার সর্বনিম্ন গড় ব্যয় বিন্দুতে পৌঁছায়। এই বিন্দুকে বলা হয় ‘ন্যূনতম দক্ষ স্কেল’ (Minimum Efficient Scale)। এই স্কেলের পর উৎপাদন বাড়ানো হলেও গড় ব্যয় আর কমে না, বরং প্রায় স্থিতিশীল থাকে। এটি ‘L’ আকৃতির রেখার সমতল অংশের মূল কারণ।
১৯।সীমিত উৎপাদন ব্যয়: বড় ফার্মগুলো অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই ধরনের ইকোনোমিস অব স্কেল উপভোগ করে। এর ফলে তাদের গড় ব্যয় প্রথমে দ্রুত কমে, তারপর ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে আসে। এই স্থিতিশীলতা রেখাটিকে ‘L’ আকৃতি দেয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট স্তরের পরে গড় ব্যয় আর কমে না।
উপসংহার: দীর্ঘকালীন গড় ব্যায় রেখা ‘L’ আকৃতির হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো ইকোনোমিস অব স্কেল বা ব্যাপক উৎপাদনের সুবিধা। একটি ফার্ম যখন তার উৎপাদন বাড়াতে থাকে, তখন বিভিন্ন কারণে তার গড় উৎপাদন ব্যয় কমে যায়। তবে, একটি নির্দিষ্ট আকারের পর এই সুবিধাগুলো আর কার্যকর থাকে না এবং গড় ব্যয় প্রায় স্থিতিশীল থাকে। এই স্থিতিশীলতা রেখার শেষ অংশকে সমতল করে, যা এটিকে দেখতে ইংরেজি অক্ষর ‘L’ এর মতো করে তোলে। এই রেখাটি প্রমাণ করে যে, বড় আকারের উৎপাদন প্রায়শই ব্যয়-কার্যকর হয়।
১। উৎপাদনের দক্ষতা বৃদ্ধি ২। ব্যাপক উৎপাদন বা ইকোনোমিস অব স্কেল ৩। অবিরাম উন্নতি ৪। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ৫। বিশেষীকরণ ও শ্রম বিভাজন ৬। যৌথ ক্রয় ক্ষমতা ৭। প্রশাসনিক দক্ষতা ৮। অর্থনৈতিক লাভ ৯। পণ্যের নকশার উন্নতি ১০। পরিমাপের সীমাবদ্ধতা ১১। অবস্থানগত সুবিধা ১২। পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ ১৩। সীমিত প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি ১৪। নির্দিষ্ট ব্যয়ের প্রভাব ১৫। বাজারের ক্ষমতা ১৬। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিসমূহ ১৭। সীমিত আকারের অপচয় ১৮। সর্বনিম্ন দক্ষ স্কেল বা MES ১৯। সীমিত উৎপাদন ব্যয়।
এই অর্থনৈতিক ধারণাটি উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শিল্প বিপ্লবের সময়কার অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলো বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৩০-এর দশকে, অর্থনীতিবিদ জন রবিনসন এবং এডওয়ার্ড চেম্বারলিন প্রমুখের কাজগুলো ইকোনোমিস অব স্কেল এবং মার্কেট স্ট্রাকচারের তত্ত্বকে আরও উন্নত করে। তারা দেখান যে, বাস্তবে অনেক ফার্ম দীর্ঘমেয়াদী গড় ব্যয় রেখা উপভোগ করে যা ‘U’ আকৃতির পরিবর্তে ‘L’ আকৃতির হয়। এর একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো হেনরি ফোর্ডের ১৯১৩ সালে চালু করা অ্যাসেম্বলি লাইন, যা ব্যাপক উৎপাদন ও শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে গাড়ির গড় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছিল। এই কৌশলটি শুধু উৎপাদন খরচই কমায়নি, বরং শিল্পে একটি নতুন মানদণ্ডও স্থাপন করেছিল। বিভিন্ন জরিপ দেখায় যে, বর্তমানেও অনেক আধুনিক ফার্ম তাদের উৎপাদনে এই নীতিগুলো প্রয়োগ করে খরচ কমিয়ে আনে। উদাহরণস্বরূপ, সফটওয়্যার এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একটি সফটওয়্যার একবার তৈরি হয়ে গেলে তার অতিরিক্ত কপি তৈরির খরচ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদী গড় ব্যয় রেখাকে অত্যন্ত সমতল করে তোলে।

