- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: নারীর ক্ষমতায়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারীরা তাদের জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া নয়, বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা লাভ করা। যখন একজন নারী তার নিজের জীবন এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দিতে ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তখনই তার ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়। এটি একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজের জন্য অপরিহার্য।
নারীর ক্ষমতায়ন (Women’s Empowerment) শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো নারীকে ক্ষমতা দেওয়া বা শক্তিশালী করা। এটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা, যা নারী ও মেয়েদের তাদের নিজস্ব জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করে। এর মূল লক্ষ্য হলো লিঙ্গ সমতা অর্জন করা এবং সমাজে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
অনেক গবেষক ও মনীষী নারীর ক্ষমতায়নকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এখানে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। অগবার্ন (Ogburn) নারীর ক্ষমতায়নকে দেখেছেন সমাজে নারীর অবস্থান পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে, যেখানে তারা পুরুষের সমান অধিকার ও সুযোগ লাভ করে।
২। নিমকফ (Nimkoff) এর মতে, নারীর ক্ষমতায়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যা নারীকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করে।
৩। ডিমক ও ডিমক (Dimock and Dimock) নারীর ক্ষমতায়নকে প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাদের মতে, এটি হলো সেই প্রক্রিয়া যেখানে নারী তাদের সক্ষমতা ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়।
৪। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White) এর মতে, নারীর ক্ষমতায়ন হলো নারীর সামগ্রিক উন্নতি ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া।
৫। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski) নারীর ক্ষমতায়নকে দেখেছেন সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার সমবণ্টন হিসেবে।
৬। কার্ল মার্কস (Karl Marx) যদিও সরাসরি নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কোনো সংজ্ঞা দেননি, তার তত্ত্ব অনুযায়ী, নারীর ক্ষমতায়ন নির্ভর করে অর্থনৈতিক মুক্তির ওপর, যেখানে উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
৭। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus) নারীর ক্ষমতায়নকে বর্ণনা করেছেন এমন একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া হিসেবে, যা নারীদের মধ্যে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে, যাতে তারা নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারে।
৮। উড্র উইলসন (Woodrow Wilson) নারীর ক্ষমতায়নকে একটি প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখেছেন, যেখানে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
উপরের বিভিন্ন সংজ্ঞার আলোকে আমরা বলতে পারি, নারীর ক্ষমতায়ন হলো এমন একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া, যা নারীদেরকে তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যাতে তারা তাদের নিজেদের এবং সমাজের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এই প্রক্রিয়া সমাজে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করে, তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করে এবং পুরুষতান্ত্রিক ধ্যানধারণার পরিবর্তন ঘটায়।
উপসংহার: নারীর ক্ষমতায়ন কেবল একটি সামাজিক ধারণা নয়, বরং একটি অপরিহার্য মানবীয় অধিকার। এর মাধ্যমে নারীরা নিজেদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার সুযোগ পায় এবং একটি উন্নত, সুষম সমাজ গঠনে কার্যকর অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি শুধু নারীর উন্নতি নয়, বরং পুরো সমাজের সার্বিক উন্নতির চাবিকাঠি।
নারীর ক্ষমতায়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারী তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা লাভ করে।
২০০০ সালে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (Millennium Development Goals) তৃতীয় লক্ষ্য ছিল লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে মাত্র ১৮টি দেশে আইনগতভাবে নারী ও পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করে। বাংলাদেশে ২০২২ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক জরিপ অনুযায়ী, লিঙ্গ সমতার সূচকে ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭১তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

