- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছ ও গতিশীল প্রশাসন। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে, অন্যদিকে তেমনি নাগরিক অধিকার রক্ষা ও জনসেবার মান বৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের উপায়সমূহ
১। আইনসভার নিয়ন্ত্রণ: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত আইনসভা প্রশাসনের উপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আইনসভায় বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্ব, আলোচনা এবং ছাঁটাই প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের যেকোনো কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। এর ফলে আমলারা নিজেদের জনগণের সেবক ভাবতে বাধ্য হন এবং স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ পান না।
২। স্বাধীন বিচারবিভাগ: প্রশাসনের যেকোনো বেআইনি বা সংবিধান পরিপন্থী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। নাগরিকরা যখনই প্রশাসনের দ্বারা হয়রানির শিকার হন, তখন তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়ে প্রতিকার পেতে পারেন। বিচারবিভাগের সক্রিয়তা ও নিরপেক্ষতা সরকারি কর্মচারীদেরকে সর্বদা আইনের মধ্যে থেকে কাজ করতে বাধ্য করে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা সুদৃঢ় করে।
৩। লোকপাল পদের সৃষ্টি: সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্তের জন্য ওমবুডসম্যান বা লোকপাল পদ অত্যন্ত কার্যকর। এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান যা সাধারণ মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে পারে। লোকপালের উপস্থিতি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মনে এক ধরনের জবাবদিহিতার ভয় তৈরি করে, যা দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনে সাহায্য করে।
৪। তথ্যের অবাধ অধিকার: তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রশাসনের ভেতরের সমস্ত গোপনীয়তা ও অস্পষ্টতা দূর করা সম্ভব হয়। নাগরিকরা যখন যেকোনো সরকারি কাজের হিসাব ও তথ্য সহজে জানতে পারে, তখন প্রশাসনের পক্ষে কোনো কিছু আড়াল করা সম্ভব হয় না। এই স্বচ্ছতা সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের প্রতি আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে এবং দুর্নীতি বহুলংশে কমিয়ে দেয়।
৫। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং অনলাইন গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়ে থাকে। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম প্রশাসনের ভুলত্রুটি, দুর্নীতি ও অনিয়ম সমাজের সামনে সাহসের সাথে তুলে ধরতে পারে। গণমাধ্যমের এই কড়া নজরদারি ও জনমতের চাপ সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে স্বচ্ছতা আনতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাধ্য করে।
৬। সুশীল সমাজের ভূমিকা: সচেতন নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজ সরকারের যেকোনো নীতি ও প্রশাসনিক কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন সেমিনার, মানববন্ধন ও আলোচনার মাধ্যমে তারা প্রশাসনের অসংগতিগুলো চিহ্নিত করে জনমত গঠন করতে পারে। সুশীল সমাজের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ আমলাতন্ত্রের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে, যা জবাবদিহিতা বাড়াতে অত্যন্ত সহায়ক।
৭। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি: সরকারি দপ্তরগুলোর কাজের গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বা এপিএ একটি আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বছরের শুরুতে তাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এবং বছর শেষে তা মূল্যায়ন করা হয়। এর ফলে কর্মকর্তাদের কাজের নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা তৈরি হয় এবং দক্ষতার সঠিক পরিমাপ করা সম্ভব হয়।
৮। উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা: প্রতিটি সরকারি দপ্তরে অভ্যন্তরীণ অডিট ও শক্তিশালী নজরদারি সেল থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের অগ্রগতি এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা যাচাই করা সম্ভব হয়। একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে প্রশাসনের নিচের স্তর থেকে শুরু করে ওপরের স্তর পর্যন্ত সবাই সতর্ক থাকে।
৯। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি: বর্তমান যুগে ই-গভর্নেন্স বা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে সহজ ও আধুনিক উপায়। অনলাইনের মাধ্যমে ফাইল ট্র্যাকিং, ই-টেন্ডারিং এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা প্রদান করায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং ঘুষের সুযোগ একদম বন্ধ হয়ে যায়। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কাজের গতি যেমন বাড়ে, তেমনি প্রতিটি কাজের ডিজিটাল রেকর্ড থেকে যায়।
১০। গণশুনানির আয়োজন: সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি চমৎকার মাধ্যম হলো নিয়মিত গণশুনানির আয়োজন করা। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাদের সমস্যা ও অভিযোগের কথা সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। কর্মকর্তাদেরও তাৎক্ষণিকভাবে সেই সব প্রশ্নের উত্তর ও সমাধান দিতে হয়, যা সরাসরি জবাবদিহিতার এক অনন্য উদাহরণ।
১১। সিটিজেন চার্টার বাস্তবায়ন: প্রতিটি সরকারি অফিসে সেবা প্রদানের বিবরণ, সময়সীমা এবং খরচের তালিকা সংবলিত সিটিজেন চার্টার বা নাগরিক সনদ দৃশ্যমান থাকা উচিত। এটি নাগরিকের একটি অধিকার যা তাকে জানায় সে কী সেবা পাওয়ার যোগ্য। যখন সেবা গ্রহীতারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, তখন সরকারি কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দিতে বাধ্য থাকে।
১২। উপযুক্ত আচরণবিধি প্রণয়ন: সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি স্পষ্ট, আধুনিক ও কঠোর আচরণবিধি থাকা এবং তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। এই আচরণবিধির মাধ্যমে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য এবং নৈতিকতার সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কোনো কর্মকর্তা এই আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
১৩। মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া: প্রশাসনে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিরা যখন মেধার জোরে প্রশাসনে আসেন, তখন তারা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন ও সৎ থাকেন। সৎ ও নৈতিক গুণসম্পন্ন কর্মকর্তারা প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে নিজ কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পিছপা হন না।
১৪। নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান: কর্মকর্তাদের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন এবং পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত আধুনিক ও নৈতিকতার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জনসেবার মূল মন্ত্র এবং জবাবদিহিতার গুরুত্ব সম্পর্কে বারবার সচেতন করা সম্ভব হয়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সেবামূলক মনোভাব জাগ্রত করা যায়।
১৫। বিকেন্দ্রীকরণ নীতি প্রয়োগ: সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে কুক্ষিগত না রেখে তা স্থানীয় সরকার ও তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয় জনগণের কাছে তাদের কাজের জন্য সরাসরি জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন। এর ফলে কেন্দ্রের ওপর কাজের চাপ কমে এবং একদম নিচের স্তর পর্যন্ত সুশাসন ও জবাবদিহিতা পৌঁছানো সম্ভব হয়।
১৬। গণভোটের সুযোগ রাখা: দেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বা বিতর্কিত কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গণভোট বা জনমতের সরাসরি প্রতিফলনের সুযোগ রাখা যেতে পারে। যদিও এটি একটি পরোক্ষ পদ্ধতি, তবুও এটি নীতি নির্ধারকদের জনআকাঙ্ক্ষা বিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। যখন প্রশাসন জানে যে তাদের যেকোনো বড় সিদ্ধান্তের জবাব জনগণের কাছে দিতে হবে, তখন তারা জনবান্ধব হতে বাধ্য হয়।
১৭। দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: সরকারি চাকরিতে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তির একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নীতিমালা কার্যকর থাকা উচিত। কর্মদক্ষতার সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদোন্নতি দিলে সৎ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তারা আরও উৎসাহিত হন। অন্যদিকে, অযোগ্য ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের শাস্তি নিশ্চিত করলে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি জবাবদিহিমূলক পরিবেশ ও শৃঙ্খলা তৈরি হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা কোনো একক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনই পারে রাষ্ট্রকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করে প্রকৃত উন্নত ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে।