- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: পৃথিবীতে মানব সমাজ যখন থেকে বিকশিত হতে শুরু করেছে, তখন থেকেই মানুষ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। এই কৌশলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উৎপাদন। এই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: উদ্ভিদ বা গাছপালা উৎপাদন, কৃষিকাজ এবং শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদন। এই তিনটি ক্ষেত্র একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং মানব সভ্যতার অগ্রগতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
প্লান্ট (Plant):-
এর শাব্দিক অর্থ হলো উদ্ভিদ বা গাছপালা। এটি এমন একটি জীবন্ত সত্তা যা সাধারণত মাটিতে জন্মায়, সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের খাদ্য তৈরি করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে।
প্লান্ট বলতে সাধারণত যেকোনো ধরনের উদ্ভিদ বা গাছপালাকে বোঝানো হয়। এটি একটি মৌলিক জৈবিক একক, যা আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্লান্ট শুধু অক্সিজেন সরবরাহ করে না, বরং এটি আমাদের খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণেরও উৎস।
প্লান্ট বা উদ্ভিদ হলো জীবন্ত সত্তা যা সাধারণত মাটি, জল ও বাতাস থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে এবং নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে। প্লান্টের কিছু প্রামাণ্য সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো:
১. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা (Encyclopaedia Britannica): প্লান্ট হলো জীবজগতের এমন একটি সদস্য যা সাধারণত সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের খাদ্য তৈরি করে, যার কোষপ্রাচীর সেলুলোজ দিয়ে তৈরি এবং যা চলনক্ষম নয়।
২. কার্ল লিনিয়াস (Carl Linnaeus): একজন সুইডিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, যিনি আধুনিক নামকরণের জনক হিসেবে পরিচিত। তিনি প্লান্টকে এমন একটি জীব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যার মধ্যে যৌন অঙ্গ থাকে এবং যা বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন প্লান্ট তৈরি করে। তার মতে, প্লান্ট হলো জীবনের সেই অংশ যা স্থির এবং প্রকৃতিতে স্থিতিশীল।
৩. প্রফেসর পিটার এইচ. রাভেন (Professor Peter H. Raven): একজন বিশ্বখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী। তার মতে, প্লান্ট হলো একটি বহু-কোষীয় ইউক্যারিওটিক জীব, যা ক্লোরোফিল ব্যবহার করে সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং যার জীবনচক্রে বিভিন্ন প্রজন্মের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন ঘটে।
এর শাব্দিক অর্থ হলো খামার। এটি এমন একটি স্থান যেখানে কৃষি ও পশুপালন সংক্রান্ত কাজ করা হয়। এটি ফসল ফলানো বা পশুপালনের জন্য ব্যবহৃত একটি জমি।
ফার্ম হলো সেই স্থান যেখানে মানুষ কৃষিভিত্তিক উৎপাদন করে। এখানে ফসল ফলানো হয়, যেমন ধান, গম, সবজি, ফল, ইত্যাদি। একই সাথে, পশুপালন, যেমন গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনও ফার্মের কাজের অন্তর্ভুক্ত। ফার্ম হলো মানব সমাজের খাদ্যের মূল উৎস।
ফার্ম বা খামার হলো এমন একটি স্থান বা সম্পত্তি যেখানে কৃষি কাজ, যেমন ফসল ফলানো, পশুপালন বা উভয়ই করা হয়। ফার্মের কিছু প্রামাণ্য সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো:
১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (U.S. Department of Agriculture – USDA): ফার্ম হলো এমন একটি স্থান যেখানে কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রতি বছর অন্তত ১,০০০ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য বিক্রি করা হয়।
২. ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (Food and Agriculture Organization – FAO): এফএও অনুসারে, ফার্ম হলো কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার একটি একক। এটি সাধারণত একটি পরিবারের মালিকানাধীন বা পরিচালিত হয়, যেখানে জমি, শ্রম, মূলধন এবং ব্যবস্থাপনা একত্রিত হয়ে কৃষি পণ্য উৎপাদন করে।
৩. অ্যারিস্টটল (Aristotle): যদিও তিনি আধুনিক অর্থে “ফার্ম” শব্দটির সংজ্ঞা দেননি, তবে তিনি তার লেখায় কৃষিকে জীবনের একটি প্রাকৃতিক ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, কৃষিকাজ হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতি থেকে সরাসরি তার জীবিকা সংগ্রহ করে, যা অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমের চেয়ে অধিক নৈতিক ও প্রয়োজনীয়।
এর শাব্দিক অর্থ হলো শিল্প বা কলকারখানা। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম যা কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করে বা পণ্য উৎপাদন করে।
শিল্প হলো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্য তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, তুলা থেকে কাপড় তৈরি করা বা লোহা থেকে ইস্পাত তৈরি করা শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিসরে পণ্য উৎপাদন করে, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
শিল্প হলো একটি অর্থনৈতিক কার্যকলাপ যা বৃহৎ পরিসরে পণ্য উৎপাদন, পরিষেবা প্রদান বা কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কাজ করে। শিল্পের কিছু প্রামাণ্য সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো:
১. অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith): তার বিখ্যাত গ্রন্থ “The Wealth of Nations”-এ তিনি শিল্পকে এমন একটি কার্যক্রম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যেখানে শ্রমের বিভাজন এবং বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। তিনি শিল্পকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেছেন।
২. কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্ক্সের মতে, শিল্প হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা পুঁজি এবং শ্রমের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তিনি শিল্পকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন যেখানে পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে মুনাফা অর্জন করে।
৩. ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): তিনি শিল্পকে একটি যৌক্তিক এবং পদ্ধতিগত অর্থনৈতিক কার্যকলাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, শিল্প আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, দক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের উপর ভিত্তি করে চলে, যা আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য।
উপসংহার: প্লান্ট, ফার্ম এবং শিল্প মানব সমাজের বিবর্তনের তিনটি ভিন্ন ধাপকে প্রতিনিধিত্ব করে। প্লান্ট বা উদ্ভিদ হলো আমাদের বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি, যা জীবনের মৌলিক উপাদান সরবরাহ করে। ফার্ম বা কৃষিখামার মানব সমাজের প্রথম সংগঠিত অর্থনৈতিক কার্যকলাপ, যা আমাদের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আর শিল্প হলো আধুনিক সমাজের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড, যা কাঁচামালকে পণ্যে রূপান্তর করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। এই তিনটি ক্ষেত্র একে অপরের পরিপূরক এবং একটি উন্নত ও টেকসই বিশ্ব গড়ার জন্য এদের সমন্বয় অপরিহার্য।

