- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকার দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বঙ্গবন্ধু সরকারের সফলতাসমূহ:
১। সংবিধান প্রণয়ন: বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম বড় সফলতা হলো স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে কার্যকর হয়। এই সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করা হয়।
২। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন: স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে, যা ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন।
৩। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন: মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বঙ্গবন্ধু সরকার এসব ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনে সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়।
৪। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্প পুনর্গঠন, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমকে পরিকল্পিত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
৫। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন: বঙ্গবন্ধু সরকার শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭২ সালের শিক্ষা কমিশন গঠন করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়।
৬। কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি: বাংলাদেশ ছিল কৃষিনির্ভর দেশ, তাই কৃষি খাতের উন্নয়নকে বঙ্গবন্ধু সরকার গুরুত্ব দেয়। কৃষকদের সহায়তা প্রদান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।
৭। শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন: স্বাধীনতার পর দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত ও অচল হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু সরকার দেশের শিল্পখাত পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার ব্যবস্থা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল করা।
৮। পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা: বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করে। “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতির আলোকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক শান্তি, সহযোগিতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৯। মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের পুনর্বাসন: মুক্তিযুদ্ধের পর অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও দেশে ফিরে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের প্রয়োজন দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু সরকার তাদের সহায়তা প্রদান এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে সমাজকে পুনর্গঠনে এসব উদ্যোগ সহায়ক হয়।
১০। প্রশাসনিক কাঠামো গঠন: স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু এবং নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়। এর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়।
উপসংহার: বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়কাল ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলতে তাঁর সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।