- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ক্ষমতা দখল, দলীয় কোন্দল এবং সহনশীলতার অভাব এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এই সহিংসতার মূল কারণগুলো গভীরভাবে জানা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সহিংসতার প্রধান কারণসমূহ
১। ক্ষমতার লোভ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত তীব্র। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে থাকলে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা যায়, এই মানসিকতা দলগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে। ফলে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা সহিংসতা ডেকে আনে। এই অন্ধ লড়াইয়ের কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। দলগুলো নিজেদের স্বার্থে অন্ধ হয়ে রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না।
২। সহনশীলতার অভাব: দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এক দল অন্য দলের মতামতকে বিন্দুমাত্র মূল্য দিতে চায় না। সুস্থ বিতর্কের পরিবর্তে কাদা ছোড়াছুড়ি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ এখানে সাধারণ ঘটনা। একে অপরকে রাজনৈতিক শত্রু ভাবার কারণে সমঝোতার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এই মানসিক দূরত্বই শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে মারাত্মক সংঘাত ও ভাঙচুরের রূপ নেয়।
৩। দলীয় কোন্দল: শুধু বিরোধী দলগুলোর মধ্যেই নয়, একই দলের অভ্যন্তরেও ব্যাপক সহিংসতা দেখা যায়। পদ-পদবি লাভ, আধিপত্য বিস্তার এবং মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে নিজেদের কর্মীরাই সংঘাতে জড়ায়। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। নিজেদের ভেতরের এই মারামারি অনেক সময় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা মারাত্মক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
৪। আইনের অপপ্রয়োগ: যখনই কোনো দল ক্ষমতায় আসে, তারা আইনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করে। বিরোধী মত দমনে পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করার অভিযোগ প্রায়শই ওঠে। সাধারণ মানুষ যখন আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন সহিংসতা বাড়ে। অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়ার কারণে নতুন করে অপরাধ করতে ভয় পায় না। ফলে সমাজে বিচারহীনতার এক মারাত্মক সংস্কৃতি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
৫| পেশিশক্তির ব্যবহার: বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুস্থ চিন্তার চেয়ে লাঠিসোঁটা ও অস্ত্রের ব্যবহার অনেক বেশি দৃশ্যমান। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় মাস্তান ও অপরাধীদের ওপর নির্ভর করে। মিছিল-মিটিং সফল করতে বা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে এই পেশিশক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে সাধারণ কর্মীরাও সহিংস হতে উৎসাহিত হয়। রাজনীতি ক্রমান্বয়ে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, যা সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কজনক।
৬। অর্থনৈতিক ফায়দা: রাজনীতি এখন অনেকের কাছে জনসেবার চেয়ে বড় ব্যবসা ও আয়ের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতা পাওয়ার পর টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন খাত থেকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিজেদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ধরে রাখতে বা অন্যের সাম্রাজ্য দখল করতে ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করা হয়। ফলে রাজনীতির মূল আদর্শ হারিয়ে গিয়ে কেবল অর্থ ও অস্ত্রের দাপট টিকে থাকে।
৭। তৃণমূলের আধিপত্য: গ্রামীণ বা স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাটবাজার, বাস টার্মিনাল বা খেয়াঘাটের ইজারা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। এই ছোট ছোট স্বার্থের সংঘাত রূপ নেয় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। বংশগত বিরোধের সাথে রাজনৈতিক পরিচয় যুক্ত হয়ে এই সহিংসতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। প্রতিটি গ্রাম বা মহল্লায় নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার এই চেষ্টা দিন দিন বাড়ছে।
৮। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া একটি বড় সমস্যা। অধিকাংশ সময় দলীয় প্রভাবে বা রাজনৈতিক বিবেচনায় আসামিরা সহজেই পার পেয়ে যায়। মামলা প্রত্যাহারের সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেশি সাহসী ও বেপরোয়া করে তোলে। যখন কেউ দেখে যে সহিংসতা করেও শাস্তি এড়ানো সম্ভব, তখন সে বারবার একই কাজ করে। এই বিচারহীনতা সমাজকে ক্রমান্বয়ে একটি গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
৯। ভুল তথ্যের বিস্তার: বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানো খুব সহজ হয়ে গেছে। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই রাজনৈতিক উসকানিমূলক পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছায়। এর ফলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত দাঙ্গা বা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ইচ্ছাকৃতভাবে আইটি সেল ব্যবহার করে এই গুজব ছড়ায়। সাধারণ মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে এই ফাঁদে পা দেয় এবং রাজপথে সহিংসতায় জড়ায়।
১০। ছাত্ররাজনীতির অপব্যবহার: শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার পরিবর্তে ছাত্ররাজনীতি এখন মূল দলগুলোর লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। হল দখল, সিট বাণিজ্য এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিয়মিত সংঘর্ষ ঘটে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর করে মিছিলে নিয়ে যাওয়া এবং অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়া সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। তরুণদের এই মেধা ও শক্তিকে ইতিবাচক কাজে না লাগিয়ে সহিংসতায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষাঙ্গনগুলো প্রতিনিয়ত অশান্ত হয়ে উঠছে এবং শিক্ষার আলো ব্যাহত হচ্ছে।
১১। নির্বাচনী ব্যবস্থা: নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা দেখতে পাওয়া যায়। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তীব্র অবিশ্বাস রয়েছে। এই অবিশ্বাসের কারণে ভোটের আগে, ভোট চলাকালীন এবং পরে ব্যাপক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। বিজয়ী দল অনেক সময় বিজিত দলের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। ক্ষমতার এই পালাবদল শান্তিপূর্ণ না হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়।
১২। নেতৃত্বের অহংকার: শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনমনীয় মনোভাব এবং অহংকার সমঝোতার পথ বন্ধ করে দেয়। নেতারা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে চান না এবং যেকোনো মূল্যে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চান। এই জেদ মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অন্ধ আবেগের জন্ম দেয়। আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান না করে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের নীতি গ্রহণ করা হয়। ফলে নেতাদের অহংকারের মাশুল দিতে হয় সাধারণ নিরীহ কর্মীদের নিজের জীবন দিয়ে।
১৩। বিদেশী হস্তক্ষেপ: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভূ-রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন বিদেশী শক্তির নানামুখী প্রভাব রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে বা ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিদেশী শক্তির সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করে। এই বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণ দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও জটিল ও সহিংস করে তোলে। যখন দেশীয় সমস্যার সমাধান দেশের বাইরে খোঁজা হয়, তখন সার্বভৌমত্ব যেমন হুমকিতে পড়ে, তেমনি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের তীব্রতাও বহুগুণ বেড়ে যায়।
১৪। বেকারত্ব সমস্যা: দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত তরুণ যুবসমাজ কর্মসংস্থানের অভাবে ভুগছে। এই বেকার যুবকদের রাজনৈতিক দলগুলো খুব সহজেই নিজেদের স্বার্থে টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করতে পারে। কোনো কাজ না থাকায় তারা দ্রুত রাজনৈতিক মিছিল, মিটিং এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ক্ষণস্থায়ী লাভ এবং ক্ষমতার মোহে পড়ে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে এই যুবশক্তিকে সহিংসতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।
১৫। গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব: কিছু গণমাধ্যম নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। সত্য ঘটনা আড়াল করে একপেশে সংবাদ প্রচারের ফলে সমাজে ভুল বার্তা পৌঁছায়। এর ফলে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়, যা সহিংসতাকে উসকে দেয়। গণমাধ্যম যদি সমাজের দর্পণ হিসেবে সঠিক তথ্য তুলে না ধরে, তবে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। এই বিভ্রান্তি একসময় রাজপথে সহিংস সংঘর্ষের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
১৬। সুশীল সমাজের নিষ্ক্রিয়তা: দেশের বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজ ক্রমান্বয়ে মেরুকরণের শিকার হয়ে নির্দিষ্ট দলের অনুসারী হয়ে পড়েছেন। তারা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংকটের গঠনমূলক সমালোচনা বা সমাধানের পথ দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। সুশীল সমাজের এই নীরবতা বা দলীয় লেজুড়বৃত্তি সমাজকে দিকনির্দেশনাহীন করে তুলেছে। তারা যদি সাহসের সাথে সত্য কথা না বলেন, তবে রাজনীতি আরও বেশি সহিংস হবে। তাদের নিষ্ক্রিয়তা অন্যায়কারীদের আরও বেশি উৎসাহিত ও বেপরোয়া করে তুলছে।
১৭। ঐতিহাসিক প্রতিশোধ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমিতে রয়েছে এক দল কর্তৃক অন্য দলের ওপর অত্যাচারের দীর্ঘ স্মৃতি। ক্ষমতায় এলে পূর্ববর্তী দলের অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়ার এক ভয়াবহ মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিশোধের চক্র বছরের পর বছর ধরে আবর্তিত হচ্ছে এবং এর কোনো শেষ নেই। এক দল ভাবতেই পারে না যে অন্য দল ক্ষমতায় এলে তারা নিরাপদে থাকবে। এই অস্তিত্বের লড়াই শেষ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত চরম সহিংসতায় রূপ নেয়।
শেষকথা: রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এই আত্মঘাতী সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে দলগুলোকে সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। পারস্পরিক সংলাপ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সহনশীলতার চর্চা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশের সাধারণ মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে অবিলম্বে এই হিংসাত্মক রাজনীতির অবসান ঘটানো জরুরি।