- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে এক ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেছে। নানা চ্যালেঞ্জ ও বাধা-বিপত্তি পেরিয়েও এদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র কেবল টিকে থাকেনি, বরং সাফল্যের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে। এই সাফল্যের মূলে রয়েছে বেশ কিছু সুদৃঢ় ভিত্তি এবং সুচিন্তিত নীতি, যা ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব: আমাদের সংবিধান হলো দেশের মূল ভিত্তি, যা গণতন্ত্রের আদর্শ ও কাঠামোকে সুনিশ্চিত করে। এটি মৌলিক অধিকার, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা গণতন্ত্রকে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং এর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। এই সংবিধানই দেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে সকলকে সমানাধিকার ও সুযোগ দিয়েছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়িয়েছে। (১)
প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার: সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের প্রবর্তন একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল, যা দেশের প্রতিটি নাগরিককে, সে যে সামাজিক বা অর্থনৈতিক স্তরেরই হোক না কেন, সরকার গঠনে সরাসরি অংশ নেওয়ার অধিকার দিয়েছে। এই অধিকার রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে এবং ক্ষমতাকে শুধুমাত্র বিশেষ শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত হতে দেয়নি। এটি নিশ্চিত করেছে যে প্রত্যেক মানুষের কণ্ঠস্বর নির্বাচনে গুরুত্ব পাবে, যা গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকৃতিকে শক্তিশালী করেছে। (২)
স্বাধীন নির্বাচন কমিশন: ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি স্বায়ত্তশাসিত এবং নিরপেক্ষ সংস্থা, যা দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য দায়ী। এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করে যে নির্বাচন প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে এবং সময়মতো ও সুচারুভাবে অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনের এই সততা ও কার্যকারিতা নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি জনগণের বিশ্বাস বজায় রাখতে এবং গণতান্ত্রিক আদর্শকে সমুন্নত রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (৩)
বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং অন্যান্য আদালতগুলো দেশের সংবিধানের রক্ষক হিসেবে কাজ করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে যে কোনো রাজনৈতিক চাপ বা সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তারা ন্যায়বিচার প্রদান করতে পারে। এটি আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে সহায়ক। সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা রোধে বিচার বিভাগের এই সক্রিয় ভূমিকা গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। (৪)
রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তা: ভারতে একটি বহুদলীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান, যেখানে জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরে অসংখ্য রাজনৈতিক দল সক্রিয়। এই দলগুলো বিভিন্ন মতাদর্শ ও স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এবং নিয়মিতভাবে প্রতিযোগিতা করে। এই সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে বিভিন্ন মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকে এবং সরকারের জবাবদিহিতা বজায় থাকে। এই প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রকে গতিশীল রাখতে সাহায্য করে। (৫)
সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা: সংবাদ মাধ্যম, যা প্রায়শই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত, সরকারের নীতি ও কাজের উপর নজর রাখে এবং জনগণকে অবহিত করে। একটি স্বাধীন এবং দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং সরকারের সমালোচনা করে তাকে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করে। যদিও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও সার্বিকভাবে সংবাদ মাধ্যম স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক। (৬)
সহনশীল ও ঐকমত্য: ভারতীয় সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়, যেখানে ঐকমত্য তৈরির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সহাবস্থানের মানসিকতা সংঘাত এড়াতে এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করেছে, যা গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য জরুরি। (৭)
আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ: ভারতীয় গণতন্ত্র আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং আকাঙ্ক্ষাগুলিকে স্বীকার করে এবং সেগুলোর পূরণের জন্য একটি ফেডারেল কাঠামো তৈরি করেছে। রাজ্যগুলোর হাতে নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকার কারণে আঞ্চলিক পরিচয় এবং স্বার্থের প্রতি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ আঞ্চলিক অসন্তোষ কমাতে এবং জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য সুবিধাজনক। (৮)
নেতৃত্বের গুণাগুণ: বিভিন্ন সময়ে ভারতে জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী, এবং অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো দূরদর্শী ও শক্তিশালী নেতৃত্ব দেখা গেছে, যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। এই নেতারা প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা বজায় রেখেছেন এবং সংকটকালীন সময়েও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত হতে দেননি। তাদের প্রতিশ্রুতি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষমতা গণতন্ত্রকে অবিচলিত থাকতে সাহায্য করেছে। (৯)
সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা: ভারতের সামরিক বাহিনী দৃঢ়ভাবে গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তৃত্বের প্রতি আস্থাশীল এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকে। এই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে যে ক্ষমতার পরিবর্তন সর্বদা সাংবিধানিক উপায়ে হয় এবং সামরিক অভ্যুত্থানের মতো কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় না। সেনাবাহিনীর এই পেশাদারিত্ব এবং আনুগত্য গণতন্ত্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। (১০)
শিক্ষার প্রভাব: শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে রাজনৈতিক সচেতনতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষিত নাগরিকরা সরকারের নীতি বুঝতে পারে, তাদের অধিকার সম্পর্কে অবগত থাকে এবং সঠিক প্রার্থী নির্বাচনে আরও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। যদিও শতভাগ শিক্ষা এখনো অর্জিত হয়নি, তবুও ক্রমবর্ধমান সাক্ষরতা জনগণকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আরও অর্থপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছে। (১১)
স্থানীয় স্ব-শাসন: পঞ্চায়েত ও পৌরসভার মতো স্থানীয় স্ব-শাসিত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গণতন্ত্রকে একেবারে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে এবং সাধারণ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন সমস্যা ও উন্নয়নমূলক কাজে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহিত করে। স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে তুলেছে এবং নেতৃত্বের জন্ম দিয়েছে। (১২)
নাগরিক সমাজের ভূমিকা: ভারতে নাগরিক সমাজের সংস্থা (সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন), এনজিও এবং জনকল্যাণমূলক গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত সক্রিয়। এই সংস্থাগুলো সরকারের উপর নজরদারি করে, জনগণের অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরি করে এবং নীতি নির্ধারণে চাপ সৃষ্টি করে। এই সক্রিয়তা সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে এবং গণতান্ত্রিক আদর্শ রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (১৩)
সাংবাদিকতার ঐতিহ্য: ভারতীয় সাংবাদিকতার একটি দীর্ঘ ও গর্বিত ইতিহাস রয়েছে, যা ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকেই স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। যদিও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও বেশিরভাগ গণমাধ্যম পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে এবং ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখে। এই শক্তিশালী ঐতিহ্য মুক্ত আলোচনার পরিবেশ তৈরি করেছে, যা গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। (১৪)
বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি: ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম সাফল্য হলো দেশের অসংখ্য ভাষা, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে কেবল স্বীকৃতি দেওয়াই নয়, বরং সেগুলোকে সম্মান জানানো। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করেছে যে কোনো বড় গোষ্ঠীই যেন একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ না করে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারও সংরক্ষিত থাকে। এই বৈচিত্র্যের সহাবস্থানই ভারতের গণতন্ত্রকে অদ্বিতীয় করে তুলেছে। (১৫)
বিরোধীদের শক্তিশালী উপস্থিতি: ভারতীয় সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিরোধী দল সরকারের কাজের সমালোচনা করে, নীতির ভুলগুলো তুলে ধরে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে। এই নিরীক্ষণ ও ভারসাম্য (Check and Balance) ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করে যে সরকার স্বেচ্ছাচারী না হয়ে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, যা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য অত্যাবশ্যক। (১৬)
শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর: ভারতের ইতিহাসে বারবার নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে। যখনই কোনো দল বা জোট নির্বাচনে পরাজিত হয়, তারা জনরায়কে মেনে নিয়ে সহজে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এই ঐতিহ্য প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, যা এই শাসন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও পরিপক্কতা নির্দেশ করে। (১৭)
উপসংহার: ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের এই সাফল্য রাতারাতি আসেনি; এটি সাংবিধানিক দূরদর্শিতা, নেতৃত্বের অঙ্গীকার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। বিশাল বৈচিত্র্য এবং জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ সত্ত্বেও, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে অবিচল আস্থা রাখাই এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে সম্ভব করে তুলেছে, যা বিশ্বকে এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ প্রদান করে।

