- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মুদ্রাস্ফীতি একটি বহুল প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণা যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রায়শই আমরা জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কথা শুনি, কিন্তু এর পেছনের মূল কারণ এবং এর প্রভাব সম্পর্কে বিশদভাবে জানা জরুরি। মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক হলো সেই অর্থনৈতিক অবস্থা যা এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণকে ব্যাখ্যা করে। এই নিবন্ধে আমরা মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক সম্পর্কে সহজ, সরল এবং আকর্ষণীয় ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করব।
শাব্দিক অর্থ: মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক (Inflationary Gap) শব্দটি আক্ষরিক অর্থে বোঝায় চাহিদার অতিরিক্ত সরবরাহ। অর্থাৎ, যখন কোনো অর্থনীতিতে মোট চাহিদা, তার উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়, তখন এই ফাঁক তৈরি হয়।
অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝানো হয় যখন কোনো দেশের পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরে (Full Employment Level) সামগ্রিক চাহিদা (Aggregate Demand) সামগ্রিক সরবরাহকে (Aggregate Supply) ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে, বাজারে চাহিদার চাপ অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং জিনিসপত্রের দাম ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই অতিরিক্ত চাহিদার কারণ হলো জনসাধারণের হাতে অতিরিক্ত অর্থ বা ক্রয়ক্ষমতা থাকা, যা বাজারের বিদ্যমান পণ্য ও পরিষেবার তুলনায় বেশি।
এই বিষয়ে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের দেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো:
১।জন মেনার্ড কেইনস (John Maynard Keynes): কেইনস মুদ্রাস্ফীতির ফাঁককে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সৃষ্ট এমন একটি পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে অর্থনীতি তার সর্বোচ্চ উৎপাদন সীমায় পৌঁছে গেছে, কিন্তু জনগণের ক্রয়ক্ষমতা আরও বেশি। এর ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। (Keynes defined inflationary gap as a situation where aggregate demand exceeds aggregate supply at the full employment level, leading to a rise in prices.)
২।পল এ. স্যামুয়েলসন (Paul A. Samuelson): স্যামুয়েলসন মুদ্রাস্ফীতির ফাঁককে ‘অর্থনীতিতে বিদ্যমান অতিরিক্ত চাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা মূল্যস্তরকে উপরের দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর মতে, এটি হলো সেই পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ যা সামগ্রিক সরবরাহ থেকে অতিরিক্তভাবে বিদ্যমান থাকে। (Samuelson described the inflationary gap as the excess pressure in the economy that pushes the price level upwards, representing the amount of excess purchasing power relative to the available supply.)
৩।মিল্টন ফ্রিডম্যান (Milton Friedman): ফ্রিডম্যানের মতে, মুদ্রাস্ফীতি সর্বদা একটি আর্থিক ঘটনা। তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে, অতিরিক্ত অর্থের সরবরাহ যখন উৎপাদনশীলতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক তৈরি হয়, যা মূল্যস্ফীতির মূল কারণ। (According to Friedman, inflation is always a monetary phenomenon. From his perspective, the inflationary gap is created when the money supply exceeds productivity, which is the root cause of inflation.)
৪।আর্থার সি. পিগৌ (Arthur C. Pigou): পিগৌ মুদ্রাস্ফীতির ফাঁককে সেই পরিস্থিতি হিসেবে দেখেন যেখানে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা প্রকৃত উৎপাদনে কোনো বৃদ্ধি না ঘটিয়ে কেবল মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়। (Pigou viewed the inflationary gap as a situation where an increase in wages leads to a rise in aggregate spending, causing only a rise in prices without any increase in real output.)
৫।রবার্ট জে. গর্ডন (Robert J. Gordon): গর্ডন আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুদ্রাস্ফীতির ফাঁককে একটি অর্থনীতিতে প্রকৃত জিডিপি (Real GDP) এবং সম্ভাব্য জিডিপি (Potential GDP) এর মধ্যকার পার্থক্য হিসেবে বর্ণনা করেন। যখন প্রকৃত জিডিপি সম্ভাব্য জিডিপিকে অতিক্রম করে, তখন মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক সৃষ্টি হয়। (Gordon, from a modern perspective, described the inflationary gap as the difference between an economy’s real GDP and its potential GDP. An inflationary gap is created when real GDP exceeds potential GDP.)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা মুদ্রাস্ফীতির ফাঁককে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি:
যখন কোনো অর্থনীতিতে পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরে সামগ্রিক চাহিদা, সামগ্রিক সরবরাহকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সৃষ্ট অতিরিক্ত চাহিদার চাপকে মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক বলা হয়।
উপসংহার: পরিসমাপ্তিতে আমরা বলতে পারি যে, মুদ্রাস্ফীতির ফাঁক হলো অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ যা জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়।

