- readaim.com
- 0
উত্তর::উপক্রমণিকা: নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, রেনেসাঁ যুগের এক বিতর্কিত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’-এ (The Prince) রাজনীতির এক বাস্তবসম্মত ও কঠোর চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একজন শাসককে অবশ্যই প্রচলিত নৈতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে, যদি সে তার রাজ্যকে রক্ষা করতে ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায়। এই ভাবনা থেকেই উদ্ভব হয়েছে তাঁর বহুল সমালোচিত নৈতিকতার দ্বৈত মানদণ্ড-এর ধারণা।
ম্যাকিয়াভেলির মতে, একজন শাসকের জন্য ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নৈতিকতা এক নয়। সাধারণ মানুষের জন্য যে সততা, দয়া ও ন্যায়পরায়ণতা জরুরি, একজন শাসকের জন্য তা সব সময় প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সাধারণ নৈতিকতা অনেক সময় দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই একজন শাসককে প্রয়োজন অনুযায়ী ভালো বা মন্দ—উভয় পথই বেছে নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
ম্যাকিয়াভেলি বলেন, শাসককে সিংহের মতো শক্তিশালী এবং একই সাথে শিয়ালের মতো ধূর্ত হতে হবে। সিংহ তার শক্তি দিয়ে শত্রুকে ভয় দেখায়, আর শিয়াল তার ধূর্ততা দিয়ে ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করে। অর্থাৎ, একজন শাসককে যেমন প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে, তেমনি তাকে কৌশল ও ছলনার আশ্রয়ও নিতে হতে পারে। জনসমক্ষে তাকে ধার্মিক, দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হবে, কিন্তু গোপনে তাকে যেকোনো নিষ্ঠুর বা অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করলে চলবে না। তার মূল লক্ষ্য থাকবে রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত ও শক্তিশালী রাখা। এই যে সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের নৈতিকতা এবং শাসকের জন্য ভিন্ন ধরনের নৈতিকতার ধারণা, একেই বলা হয় নৈতিকতার দ্বৈত মানদণ্ড।
উপসংহার: ম্যাকিয়াভেলীর নৈতিকতার এই দ্বৈত মানদণ্ড আজও রাজনৈতিক বিতর্কের এক প্রধান বিষয়। এটি একদিকে যেমন শাসকদের ক্ষমতা রক্ষার কৌশল শেখায়, অন্যদিকে তেমনি জনস্বার্থে নৈতিকতার সীমালঙ্ঘন করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে এটি অনস্বীকার্য যে, ম্যাকিয়াভেলীর এই ধারণা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে রাজনীতির বাস্তবতাকে আদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ম্যাকিয়াভেলি বর্ণিত নৈতিকতার দ্বৈত মানদণ্ড হলো শাসকদের জন্য প্রচলিত নৈতিকতার বাইরে গিয়ে ক্ষমতা ও রাষ্ট্র রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দর্শন।
ম্যাকিয়াভেলি ১৫১৩ সালে ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থটি রচনা করেন, যা ১৫৩২ সালে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। বইটিতে তিনি ১৫শ শতাব্দীর ইতালির রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেন। এই বইটি রেনেসাঁস যুগের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় এক বিশাল পরিবর্তন আনে, যা বহু শাসক ও রাজনৈতিক নেতাকে প্রভাবিত করেছে। এই নীতি প্রয়োগের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো ইতালির সেজার বোর্জিয়া, যিনি ক্ষমতার জন্য নৈতিকতার তোয়াক্কা করেননি।

