- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো লেনদেন ভারসাম্য (Balance of Payments) ও বাণিজ্য ভারসাম্য (Balance of Trade)। এই দুটি প্রায়শই এক মনে হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য বোঝা একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই নিবন্ধে, আমরা এই দুই ধারণার মধ্যেকার মূল ভিন্নতাগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরব।
১।বিস্তৃতি: লেনদেন ভারসাম্য একটি দেশের সঙ্গে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর মধ্যে ঘটা সমস্ত অর্থনৈতিক লেনদেনকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মধ্যে কেবল পণ্য ও পরিষেবা আমদানি-রপ্তানিই নয়, বরং মূলধন স্থানান্তর, বিনিয়োগ, ঋণ এবং অনুদানের মতো অদৃশ্য লেনদেনগুলোও অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি দেশের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। অন্যদিকে, বাণিজ্য ভারসাম্য শুধুমাত্র একটি দেশের পণ্য আমদানি এবং রপ্তানির মূল্য নিয়ে গঠিত, যা অর্থনীতির শুধুমাত্র একটি অংশকে প্রতিফলিত করে। এটি দৃশ্যমান বা স্পর্শযোগ্য জিনিসপত্র যেমন – পোশাক, গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদির ব্যবসার হিসাব রাখে।
২।উপাদান: লেনদেন ভারসাম্যে দুটি প্রধান হিসাব থাকে: চলতি হিসাব (Current Account) এবং মূলধন ও আর্থিক হিসাব (Capital and Financial Account)। চলতি হিসাবে পণ্য ও পরিষেবা ছাড়াও রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় এবং অনুদান অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে, মূলধন ও আর্থিক হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ, ঋণ এবং অন্যান্য মূলধন স্থানান্তর দেখানো হয়। এর বিপরীতে, বাণিজ্য ভারসাম্যের হিসাব অনেক সহজ, যেখানে কেবল পণ্য আমদানি ও রপ্তানির মূল্যের পার্থক্য দেখানো হয়। এটি প্রধানত একটি দেশের রপ্তানি থেকে আয়ের সাথে আমদানি বাবদ ব্যয়ের তুলনা করে।
৩।লক্ষ্য: লেনদেন ভারসাম্যের প্রধান লক্ষ্য হলো একটি দেশের আন্তর্জাতিক লেনদেনের সামগ্রিক হিসাব রাখা এবং তা ভারসাম্যপূর্ণ কি না তা যাচাই করা। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ বোঝা যায়। এর হিসাব সর্বদা শূন্য বা ভারসাম্যপূর্ণ হয়, কারণ কোনো ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত হলে তা ঋণ, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ অথবা মূলধন স্থানান্তরের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। অন্যদিকে, বাণিজ্য ভারসাম্যের লক্ষ্য হলো একটি দেশের শুধুমাত্র পণ্য বাণিজ্যের অবস্থা মূল্যায়ন করা, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঘাটতি (আমদানি > রপ্তানি) বা উদ্বৃত্ত (রপ্তানি > আমদানি) দেখাতে পারে।
৪।ফলাফল: বাণিজ্য ভারসাম্যের ফলাফল একটি দেশের বাণিজ্যিক শক্তি বা দুর্বলতা নির্দেশ করে। যখন একটি দেশ রপ্তানির চেয়ে বেশি আমদানি করে, তখন বাণিজ্য ঘাটতি দেখা যায়, যা সাধারণত দেশের মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর উল্টোটা ঘটলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হয়। তবে, লেনদেন ভারসাম্য তার সংজ্ঞাগত কারণেই সর্বদা ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। যদি চলতি হিসাবে ঘাটতি হয়, তা মূলধন ও আর্থিক হিসাব থেকে আসা উদ্বৃত্ত দিয়ে পূরণ করা হয় এবং এর ফলস্বরূপ সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের হিসাব সবসময় শূন্য হয়। এর মানে হলো, এটি সব ধরনের লেনদেনকে একত্রিত করে হিসাবের মিল নিশ্চিত করে।
৫।সংজ্ঞায়ন: লেনদেন ভারসাম্যকে একটি দেশের সঙ্গে বিশ্বের বাকি অংশের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সংঘটিত সমস্ত অর্থনৈতিক লেনদেনের পদ্ধতিগত লিপিবদ্ধকরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি একটি দেশের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতার একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি উপস্থাপন করে। এর বিপরীতে, বাণিজ্য ভারসাম্যকে একটি দেশের দৃশ্যমান বা স্পর্শযোগ্য পণ্যের রপ্তানি এবং আমদানির মূল্যের মধ্যকার পার্থক্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কেবলমাত্র একটি অংশকে প্রতিফলিত করে।
৬।লেনদেনের ধরন: লেনদেন ভারসাম্যে উভয় ধরনের লেনদেন অন্তর্ভুক্ত থাকে: দৃশ্যমান ও অদৃশ্য। দৃশ্যমান লেনদেনের মধ্যে রয়েছে পণ্যসামগ্রীর আমদানি-রপ্তানি, যা বাণিজ্য ভারসাম্যে দেখা যায়। অদৃশ্য লেনদেনের মধ্যে আছে সেবা, যেমন পর্যটন ও পরিবহন, এবং মূলধন স্থানান্তর, যেমন বৈদেশিক বিনিয়োগ, ঋণ এবং অনুদান। অন্যদিকে, বাণিজ্য ভারসাম্যে শুধুমাত্র দৃশ্যমান বা পণ্যভিত্তিক লেনদেন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এটি একটি দেশের পণ্য আমদানির ব্যয় এবং রপ্তানির আয়ের মধ্যেকার পার্থক্য প্রকাশ করে।
৭।অর্থনৈতিক প্রভাব: বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত একটি দেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বাণিজ্য ঘাটতি দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাতে পারে এবং কর্মসংস্থান হ্রাস করতে পারে, কারণ বিদেশি পণ্য দেশীয় বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে। লেনদেন ভারসাম্যের সামগ্রিক চিত্র অর্থনীতির একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ দেয়। লেনদেন ভারসাম্যের একটি শক্তিশালী চলতি হিসাব একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সক্ষমতা নির্দেশ করে, যখন ঘাটতি দুর্বলতা প্রকাশ করে।
৮।উন্নয়নশীল দেশ: উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই দুটি ধারণার পার্থক্য বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক উন্নয়নশীল দেশে বাণিজ্য ঘাটতি থাকে (কারণ তারা বেশি পণ্য আমদানি করে), কিন্তু লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত থাকতে পারে যদি তারা রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) এবং বিদেশি সাহায্য বাবদ প্রচুর অর্থ পায়। এই আয়গুলো লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবের একটি অংশ হিসেবে নিবন্ধিত হয়, যা বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। তাই শুধুমাত্র বাণিজ্য ভারসাম্য দেখে একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না।
৯।ব্যবহার: নীতি নির্ধারকরা উভয় ভারসাম্যকে আলাদাভাবে ব্যবহার করে। বাণিজ্য ভারসাম্য সাধারণত একটি দেশের বাণিজ্য নীতি নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়, যেমন শুল্ক বা কোটা আরোপের সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে, লেনদেন ভারসাম্য ব্যবহার করা হয় সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি, যেমন মুদ্রানীতি বা বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য। সরকার বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণের পরিমাণ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের প্রবাহ বোঝার জন্য লেনদেন ভারসাম্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে।
১০।সম্পর্ক: লেনদেন ভারসাম্যের একটি অংশ হলো বাণিজ্য ভারসাম্য। অর্থাৎ, বাণিজ্য ভারসাম্য হলো একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার একটি উপাদান। বাণিজ্য ভারসাম্যের হিসাব প্রথমে করা হয়, এবং এর ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবের একটি অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই, যখন আমরা লেনদেন ভারসাম্য নিয়ে কথা বলি, আমরা আসলে বাণিজ্য ভারসাম্য এবং আরও অনেক কিছু যেমন – পরিষেবা, আয় এবং মূলধন স্থানান্তরের হিসাব নিয়ে আলোচনা করি।
✨ বিস্তৃতি 📊 উপাদান 🎯 লক্ষ্য 📈 ফলাফল ✍️ সংজ্ঞায়ন 🔗 লেনদেনের ধরন 📉 অর্থনৈতিক প্রভাব 🌍 উন্নয়নশীল দেশ 🛠️ ব্যবহার 🤝 সম্পর্ক।

