- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: পাকিস্তানের গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু থেকেই কাঁটাময়। সামরিক হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বারবার এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের জন্য এই সমস্যাগুলির সমাধান আজ অপরিহার্য। এই নিবন্ধে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের পথকে মসৃণ করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ আলোচনা করা হলো।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: আইনের শাসনকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা আবশ্যক, যেখানে দেশের সকল নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান—রাজনীতিবিদ, সামরিক বাহিনী এবং আমলাতন্ত্র—সকলেই আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং সকলের জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ হবে। ক্ষমতাশালীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এর জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে আসবে, যা একটি কার্যকর গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। এটি নিশ্চিত করবে যে সামরিক বা রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণী ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে না। (১)
সামরিক প্রভাব হ্রাস: সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণে তাদের ভূমিকা কেবল সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা প্রয়োজন। বেসামরিক নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, যাতে তারা সামরিক বাহিনীর প্রভাব প্রতিহত করতে পারে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি নিজেরাই গ্রহণ করতে পারে। সামরিক ও বেসামরিক সম্পর্ককে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর অধীনে আনা উচিত, যেখানে গণতন্ত্রের প্রাধান্য নিশ্চিত থাকে। সামরিক বাহিনীর জন্য জাতীয় বাজেটের বরাদ্দও স্বচ্ছ হওয়া দরকার। (২)
স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা: নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সর্বতোভাবে স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে হবে, যাতে জনগণের ভোটের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করা উচিত এবং প্রযুক্তির ব্যবহার করে ভোটার তালিকা এবং ভোট গণনার প্রক্রিয়াকে ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি এবং নির্বাচনী আইন ভঙ্গের জন্য দ্রুত ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা আবশ্যক। জনগণের মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এই সংস্কারগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। (৩)
দুর্নীতি দমন কমিশন: একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা উচিত, যা দলীয় রাজনীতি ও সামরিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে। এই কমিশনকে সকল স্তরের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, তা সে যত ক্ষমতাশালীই হোক না কেন, দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক স্তরের উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের জন্য জরুরি। (৪)
রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার: রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করা এবং দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা অপরিহার্য। পরিবারতন্ত্র ও ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে দলের নীতিনির্ধারণে তৃণমূল কর্মীদের এবং সাধারণ সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দলগুলোর অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করা উচিত এবং নির্বাচনী সংস্কারের মাধ্যমে ছোট ও নতুন দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এটি সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তৈরি করবে এবং জনগণের কাছে দলগুলোকে আরও বেশি জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে। (৫)
সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব: দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে সকল পক্ষকে সম্মান জানাতে হবে এবং এর লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। সামরিক বা বেসামরিক কোনো কর্তৃপক্ষই যেন সংবিধানের বাইরে ক্ষমতা প্রয়োগের সাহস না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সংবিধানের যেসব অনুচ্ছেদ সামরিক হস্তক্ষেপকে প্রতিহত করে, সেগুলোকে আরও মজবুত করতে হবে। নিয়মিতভাবে সাংবিধানিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সময়োপযোগী সংস্কার করাও প্রয়োজন, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করবে। (৬)
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগ ও সামরিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং বিচারকদের নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াকে মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ করা প্রয়োজন। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে বিচার বিভাগকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এর মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রক্রিয়া কার্যকর হবে। (৭)
সুশীল সমাজের ক্ষমতায়ন: সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যমকে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা ও সুযোগ দিতে হবে। মুক্ত গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নীতি ও কার্যকলাপের গঠনমূলক সমালোচনা করার অধিকারকে সুরক্ষিত করতে হবে। একই সাথে, সুশীল সমাজকেও রাজনৈতিক মেরুকরণ থেকে মুক্ত থেকে বস্তুনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করতে হবে, যা গণতন্ত্রের গুণগত মান উন্নত করতে সাহায্য করবে। (৮)
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা স্থানীয় সরকার বা প্রদেশগুলির কাছে হস্তান্তর করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা উচিত, যা তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে। শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জনগণের চাহিদা পূরণে আরও বেশি কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক হতে পারে। স্থানীয় সরকারকে পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া উচিত যাতে তারা স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করতে পারে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাবে এবং রাজনীতিতে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। (৯)
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা প্রয়োজন। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি রাজনৈতিক অস্থিরতা হ্রাস করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও টেকসই করে তোলে, কারণ অর্থনৈতিক অসন্তোষ প্রায়শই রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। (১০)
শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভোটাধিকার এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক নীতি ও সহনশীলতার ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সাক্ষরতার হার বাড়ানো এবং বিশেষ করে নারী শিক্ষায় জোর দেওয়া উচিত, কারণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীই একটি কার্যকর গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি। (১১)
সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা: ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এবং নীতিনির্ধারণে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করতে হবে। সহনশীলতা এবং বহুত্ববাদের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা উচিত, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। (১২)
আমলাতন্ত্রের সংস্কার: আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে আরও দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনমুখী করে তুলতে হবে। সরকারি পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ই-গভর্ন্যান্সের ব্যবহার বৃদ্ধি করে সরকারি প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও দুর্নীতিমুক্ত করা যেতে পারে, যা সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে। (১৩)
বৈদেশিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ: দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক শক্তির অবাঞ্ছিত প্রভাব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অন্যান্য দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উচিত, কিন্তু কোনোভাবেই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ অনুমোদন করা যাবে না। বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের সম্পদ ও সক্ষমতার উপর নির্ভর করে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা অপরিহার্য। (১৪)
নারী ও যুব অংশগ্রহণ: রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগুলিতে নারী ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। আইন প্রণয়ন করে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তাদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষণ করা যেতে পারে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এই দুটি বড় অংশকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে। (১৫)
আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা: সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে গঠনমূলক সহযোগিতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান যেন অপরটির উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। জাতীয় স্বার্থে এবং জনকল্যাণে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা ও বোঝাপড়া প্রয়োজন। এই ভারসাম্য এবং সহযোগিতা স্থিতিশীল ও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য অত্যাবশ্যক। (১৬)
উপসংহার: পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে একটি টেকসই এবং শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হলে সামরিক প্রভাব হ্রাস, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থার মতো মৌলিক সংস্কারগুলি বাস্তবায়ন করা জরুরি। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সহনশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই পাকিস্তান একটি প্রকৃত জনমুখী ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

