- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো একটি মৌলিক সামাজিক প্রক্রিয়া, যা সমাজের শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এটি এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে সমাজের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম, মূল্যবোধ এবং প্রথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করতে উৎসাহিত করে। এর মাধ্যমে সমাজ তার নিজস্ব কাঠামোকে রক্ষা করে এবং বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো সমাজই সুসংহত এবং কার্যকরী হতে পারে না।
শাব্দিক অর্থ: ‘সামাজিক নিয়ন্ত্রণ’ (Social Control) শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো ‘সমাজের নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ’। এখানে ‘সামাজিক’ শব্দটি সমাজকে নির্দেশ করে এবং ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি কোনো কিছুকে পরিচালনা বা সীমাবদ্ধ করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজ তার সদস্য এবং তাদের আচরণকে পরিচালিত ও সুশৃঙ্খল করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সামাজিক নিয়ম, মূল্যবোধ এবং প্রথার প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করা। এর ফলে সমাজের সদস্যরা এমনভাবে আচরণ করে যা সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য এবং উপকারী। এটি আনুষ্ঠানিক (যেমন- আইন, পুলিশ, আদালত) এবং অনানুষ্ঠানিক (যেমন- প্রথা, লোকাচার, ধর্ম, জনমত) উভয় উপায়ে কাজ করে।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ:-
১। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সরাসরি কোনো সংজ্ঞা না দিলেও তাঁর ‘সামাজিক স্থিতিবিদ্যা’ (Social Statics) এবং ‘সামাজিক গতিবিদ্যা’ (Social Dynamics) সম্পর্কিত আলোচনায় এর ধারণার একটি ভিত্তি তৈরি করেন। তাঁর মতে, সামাজিক স্থিতিবিদ্যা হলো সেই অংশ যা সামাজিক শৃঙ্খলা এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে কাজ করে, যা পরোক্ষভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণেরই অংশ।
২। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): সামাজিক সংহতি (Social Solidarity) এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ধারণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তার মতে, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো সমাজের নৈতিক কাঠামো যা ব্যক্তি আচরণকে পরিচালিত করে। তিনি বলেন, সামাজিক সংহতি এবং নৈতিকতা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার মূল উপাদান। তিনি এনোমি (Anomie) বা নৈরাজ্যের ধারণার মাধ্যমে দেখান যে, যখন সামাজিক নিয়ম ও মানদণ্ড দুর্বল হয়ে যায়, তখন সমাজের নিয়ন্ত্রণ কমে যায় এবং বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
৩। কার্ল মার্কস (Karl Marx): সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সামাজিক সংঘাত (Social Conflict) এবং শ্রেণি সংগ্রামের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রণ হলো শাসক শ্রেণির একটি হাতিয়ার, যা তারা উৎপাদন সম্পর্ক এবং সামাজিক কাঠামোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। তাই, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতপক্ষে সমাজের উপর প্রভাবশালী শ্রেণির একটি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা।
৪। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ‘আমলাতন্ত্র’ (Bureaucracy) এবং ‘কর্তৃত্ব’ (Authority) নিয়ে তাঁর আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি বিশেষ দিক তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আধুনিক সমাজে আনুষ্ঠানিক নিয়ম, আইন এবং যৌক্তিক-আইনি কর্তৃত্বের (Legal-rational Authority) মাধ্যমে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রক্রিয়া সমাজের সদস্যদের আচরণকে পূর্বনির্ধারিত এবং নিয়মতান্ত্রিক করে তোলে।
৫। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সংজ্ঞা দেননি, তবে তার Political Order in Changing Societies গ্রন্থে তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার উপর জোর দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, একটি কার্যকরী রাজনৈতিক ব্যবস্থা সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অনুসারে, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝায় “সামাজিক জীবনের নিয়ম ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সমাজের সদস্যদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালিত করার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন উপায়।”
৭। অধ্যাপক রস (E. A. Ross)-এর মতে, “সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো সেই উপায় ও পদ্ধতি যার মাধ্যমে সমাজ তার সদস্যদের থেকে অনুগত আচরণ আশা করে।” (Social control is the sum of those methods by which society secures from its members conformity to its expectations.)
৮। চার্লস হর্টন কুলি (Charles Horton Cooley) বলেছেন, “সামাজিক নিয়ন্ত্রণ মানে সমাজের দ্বারা ব্যক্তি আচরণের সামঞ্জস্য বিধান করা, যা সমাজে একটি স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখে।” (Social control means the adjustment of individual behavior to the group, so that a normal current of social life is maintained.)
৯। ট্যালকট পারসন্স (Talcott Parsons) সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে স্থিতিশীলতা এবং ভারসাম্যের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেন, “সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো সেই প্রক্রিয়া যা একটি সামাজিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কাজ করে।” (Social control is a process that operates to maintain the stability of a social system.)
১০। গ্যাব্রিয়েল টারডে (Gabriel Tarde) বলেন, “সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো অনুকরণ (Imitation) এবং উদ্ভাবনের (Innovation) মাধ্যমে সমাজের সদস্যদের আচরণকে পরিচালিত করার প্রক্রিয়া।” (Social control is the process of guiding the behavior of members of a society through imitation and innovation.)
উপরের সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো সমাজের সদস্যদের আচরণকে পরিচালিত, সংশোধন এবং সুশৃঙ্খল করার একটি প্রক্রিয়া, যা সমাজের নিয়ম, মূল্যবোধ, আদর্শ এবং প্রথার প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
উপসংহার: সামাজিক নিয়ন্ত্রণ একটি অবিচ্ছেদ্য প্রক্রিয়া যা মানব সমাজকে সংহত ও সুসংহত রাখতে সহায়তা করে। এটি শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষা, ধর্মীয় বিশ্বাস, পরিবার ও সংস্কৃতির মতো ইতিবাচক উপাদানের মাধ্যমেও পরিচালিত হয়। এটি সমাজের ভেতরে ব্যক্তি স্বাধীনতার ভারসাম্য রক্ষা করে এবং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের পথ সুগম করে। একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা অপরিহার্য।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হলো সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে কোনো সমাজ তার সদস্যদের আচরণকে পরিচালিত করে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
সমাজবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ব্ল্যাক (Donald Black) ১৯৭৬ সালের তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Behavior of Law’-তে দেখিয়েছেন যে, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাত্রা বিভিন্ন সমাজে ভিন্ন হয়। ১৯৯৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলোতে আনুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণের (যেমন- আইন প্রয়োগকারী সংস্থা) ব্যবহার বেশি, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ (যেমন- প্রথা ও জনমত) বেশি কার্যকর। ২০০২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক অপরাধের হার হ্রাসে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উভয় প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

