- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রমে সততা, দায়িত্বশীলতা ও জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা যায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান উপাদান হিসেবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব অপরিসীম।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিচয়:-
স্বচ্ছতা বলতে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত ও তথ্যকে স্পষ্ট, উন্মুক্ত এবং সহজে বোধগম্য রাখাকে বোঝায়। অর্থাৎ, কোনো কাজ কীভাবে, কেন এবং কোন উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানার সুযোগ থাকাই হলো স্বচ্ছতা। অন্যদিকে, জবাবদিহিতা হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিজের কাজ, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা একে অপরের পরিপূরক; স্বচ্ছতা তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করে এবং জবাবদিহিতা সেই কাজের জন্য দায় গ্রহণ নিশ্চিত করে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার শাব্দিক অর্থ:-
স্বচ্ছতা শব্দের অর্থ হলো পরিষ্কার, প্রকাশ্য বা গোপনীয়তামুক্ত অবস্থা। ইংরেজি Transparency শব্দের অর্থ হলো কোনো বিষয়কে স্পষ্ট ও উন্মুক্ত রাখা। আর জবাবদিহিতা শব্দের অর্থ হলো জবাব দেওয়ার দায়িত্ব বা নিজের কাজের হিসাব প্রদান করা। ইংরেজি Accountability শব্দের অর্থ হলো নিজের কাজের জন্য দায়ী থাকা এবং প্রয়োজন হলে তার ব্যাখ্যা প্রদান করা।
১। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): “Transparency means the condition of being easy to perceive, understand, or recognize.” অর্থাৎ, স্বচ্ছতা হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কোনো বিষয় সহজে বোঝা, উপলব্ধি করা বা চিহ্নিত করা যায়। এটি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কার্যক্রমকে স্পষ্ট ও উন্মুক্ত রাখতে সহায়তা করে।
২। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): Huntington-এর মতে, জবাবদিহিতা হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রমের জন্য জনগণ বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে উত্তর দিতে বাধ্য থাকে। এর মাধ্যমে ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা হয়।
৩। গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড (Gabriel Almond): Almond-এর মতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এমন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শাসক ও প্রশাসকরা জনগণের চাহিদা ও প্রত্যাশার প্রতি দায়িত্বশীল থাকে। এটি জনগণ ও সরকারের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলে।
৪। লুথার গুলিক (Luther Gulick): Gulick-এর মতে, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির তার অর্পিত কাজ, সিদ্ধান্ত ও ফলাফলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা প্রদানের দায়িত্ব। এটি প্রশাসনিক দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সহায়তা করে।
৫। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): Waldo-এর মতে, জবাবদিহিতা শুধু দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে নৈতিক দায়িত্ব, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতাও জড়িত। এটি একটি দায়িত্বশীল ও নৈতিক প্রশাসন গঠনে সহায়ক।
৬। ল্যারি ডায়মন্ড (Larry Diamond): Diamond-এর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হলো এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যার মাধ্যমে জনগণ সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারে এবং প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে পারে।
উপরের সংজ্ঞা ও ধারণাগুলোর আলোকে বলা যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হলো এমন দুটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত নীতি, যার মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার তাদের কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য প্রদান করে এবং সেই কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে।
উপসংহার: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এর মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতি হ্রাস পায়, মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হয়। তাই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।