- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ধারণা, যার নাম সুযোগ ব্যয়। সহজ ভাষায়, যখন আপনি একটি জিনিস পাওয়ার জন্য অন্য একটি জিনিস ত্যাগ করেন, তখন সেই ত্যাগ করা জিনিসটির মূল্যই হলো সুযোগ ব্যয়। এটি এমন একটি ধারণা যা শুধু অর্থনীতিতেই নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সুযোগ ব্যয় হলো আপনার দ্বিতীয় সেরা বিকল্পটির মূল্য। অর্থাৎ, আপনি যখন একটি সুযোগ বেছে নেন, তখন আপনাকে অন্য একটি সুযোগ ত্যাগ করতে হয়। যে সুযোগটি আপনি ত্যাগ করলেন, তার মূল্যই হলো আপনার সুযোগ ব্যয়। ধরা যাক, আপনার কাছে দুটি অপশন আছে: সিনেমা দেখতে যাওয়া অথবা একটি নতুন বই কেনা। যদি আপনি সিনেমা দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে নতুন বইটি না কেনাই হলো আপনার সুযোগ ব্যয়। এটি কোনো আর্থিক মূল্য না হয়েও একটি বাস্তব ব্যয়, কারণ আপনি বই পড়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এই চিত্রটি একটি উৎপাদন সম্ভাবনা রেখা (Production Possibility Frontier – PPF) প্রদর্শন করছে, যা সুযোগ ব্যয়ের ধারণাটি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছে।
- Y-অক্ষ (উল্লম্ব অক্ষ): ধান উৎপাদনকে নির্দেশ করছে।
- X-অক্ষ (অনুভূমিক অক্ষ): পাট উৎপাদনকে নির্দেশ করছে।
- MN রেখা: এটিই হলো উৎপাদন সম্ভাবনা রেখা (PPF), যা সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে ধান এবং পাটের বিভিন্ন সম্ভাব্য উৎপাদন সমন্বয়কে নির্দেশ করে। এই রেখার প্রতিটি বিন্দুতে সম্পদগুলো পূর্ণ দক্ষতায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এখন, সুযোগ ব্যয়ের ধারণাটি বোঝার জন্য চিত্রের দুটি ভিন্ন বিন্দু বিবেচনা করা যাক: P এবং Q।
১। বিন্দু P: এই বিন্দুতে অর্থনীতিতে OX1 পরিমাণ পাট এবং OY1 পরিমাণ ধান উৎপাদিত হচ্ছে। এই অবস্থানে থেকে যদি আমরা পাট উৎপাদন বাড়াতে চাই, তাহলে আমাদেরকে ধান উৎপাদন কমাতে হবে।
২। বিন্দু Q: এখন ধরুন, আমরা P বিন্দু থেকে Q বিন্দুতে সরে আসছি। Q বিন্দুতে পাট উৎপাদন বেড়ে OX2 হয়েছে, কিন্তু ধান উৎপাদন কমে OY2 হয়েছে।
এখানে, পাট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে (X1 থেকে X2) এবং ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে (Y1 থেকে Y2)।
এই পরিবর্তনটিই সুযোগ ব্যয়কে নির্দেশ করে। P বিন্দু থেকে Q বিন্দুতে যাওয়ার জন্য আমরা যে অতিরিক্ত পাট পেয়েছি, তার জন্য আমাদের যে পরিমাণ ধান উৎপাদন ত্যাগ করতে হয়েছে, সেটাই হলো অতিরিক্ত পাটের সুযোগ ব্যয়।
- অতিরিক্ত পাট উৎপাদন = X2−X1
- ত্যাগ করা ধান উৎপাদন = Y1−Y2
সুতরাং, X2−X1 পরিমাণ অতিরিক্ত পাটের সুযোগ ব্যয় হলো Y1−Y2 পরিমাণ ধান।
এই চিত্রটি স্পষ্ট করে দেখায় যে, সীমিত সম্পদের কারণে একটি পণ্য বেশি উৎপাদন করতে হলে অন্য পণ্যটি কম উৎপাদন করতে হবে। উৎপাদন সম্ভাবনা রেখার ঢাল (slope) বিভিন্ন বিন্দুতে সুযোগ ব্যয়ের পরিমাণ নির্দেশ করে। রেখাটি যেমন বাঁকা, তা থেকে বোঝা যায় যে, অতিরিক্ত একক উৎপাদন করতে গেলে ক্রমশ বেশি পরিমাণে অন্য পণ্যটি ত্যাগ করতে হয়, যা ক্রমবর্ধমান সুযোগ ব্যয় (Increasing Opportunity Cost) নামে পরিচিত।
উপসংহার: সুযোগ ব্যয় হলো এমন একটি অদৃশ্য মূল্য যা আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত। এটি আমাদের শেখায় যে, কোনো সিদ্ধান্তই বিনা মূল্যে আসে না এবং প্রতিটি পছন্দের পেছনে একটি ত্যাগ থাকে। এই ধারণাটি কেবল অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণেই নয়, বরং আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের উপলব্ধিতে সাহায্য করে যে, আমরা কোন জিনিসটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি এবং তার জন্য কী ত্যাগ করছি।
যখন একটি জিনিস পাওয়ার জন্য অন্য একটি জিনিস ত্যাগ করা হয়, তখন ত্যাগ করা জিনিসটির মূল্যই হলো সুযোগ ব্যয়।
সুযোগ ব্যয় আধুনিক অর্থনীতির একটি মৌলিক ধারণা যা ১৭০০-এর দশকের শেষ দিকে অ্যাডাম স্মিথ-এর কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, সীমিত সম্পদের যথাযথ বন্টনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং ১৯৫০-এর দশকে পল স্যামুয়েলসন তাঁর বিখ্যাত অর্থনীতি বিষয়ক গ্রন্থে এই ধারণাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন। ২০১৯ সালের এক জরিপে দেখা যায়, সুযোগ ব্যয় সম্পর্কে ধারণা থাকা মানুষ ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিক কার্যকর।

