- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: অর্থনীতির জগতে ভোক্তার আচরণ বিশ্লেষণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই আচরণ বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদগণ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তত্ত্ব ও ধারণা প্রদান করেছেন। নিরপেক্ষ রেখা বা ‘Indifference Curve’ হলো এমনই একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণমূলক টুল যা ভোক্তার পছন্দ এবং উপযোগের মাত্রাকে графі আকারে তুলে ধরে। এটি দেখায় কিভাবে একজন ভোক্তা দুটি পণ্যের বিভিন্ন সংমিশ্রণ থেকে সমান সন্তুষ্টি লাভ করে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট সংমিশ্রণের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয় না, অর্থাৎ নিরপেক্ষ থাকে। এই ধারণাটি আধুনিক ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করেছে।
শাব্দিক অর্থ: “নিরপেক্ষ রেখা” কথাটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে ‘নিরপেক্ষ’ বলতে বোঝায় কোনো কিছুর প্রতি পক্ষপাতহীন বা উদাসীন থাকা। আর ‘রেখা’ হলো একটি চিত্রলেখ বা সঞ্চারপথ। সুতরাং, শাব্দিক অর্থে নিরপেক্ষ রেখা হলো এমন একটি পথ যার প্রতিটি বিন্দুর প্রতি ভোক্তা indiferente বা নিরপেক্ষ থাকে।
অর্থনীতিতে, নিরপেক্ষ রেখা হলো এমন একটি রেখা যা দুটি পণ্যের বিভিন্ন সংমিশ্রণ দেখায় যা একজন ভোক্তাকে সমান স্তরের সন্তুষ্টি বা উপযোগ প্রদান করে। এই রেখার প্রতিটি বিন্দুতে ভোক্তা সমান তৃপ্তি লাভ করে বলে সে এই বিন্দুগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না বা নিরপেক্ষ থাকে। ভোক্তা কোন সংমিশ্রণটি ভোগ করবে, সে বিষয়ে তার কোনো বিশেষ পছন্দ বা অপছন্দ থাকে না। সাধারণত, এই রেখাটি বাম থেকে ডানে নিম্নগামী এবং মূলবিন্দুর দিকে উত্তল হয়ে থাকে।
আধুনিক অর্থনীতিতে নিরপেক্ষ রেখা একটি অপরিহার্য ধারণা এবং বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য গবেষকের সংজ্ঞা প্রদান করা হলো:
১। অধ্যাপক জে. আর. হিকস (J. R. Hicks)-এর মতে, “নিরপেক্ষ রেখা হলো এমন একটি সঞ্চারপথ যা দুটি পণ্যের এমন সব সংমিশ্রণ নির্দেশ করে যেগুলোর মধ্যে ব্যক্তি নিরপেক্ষ থাকে, তাই একে নিরপেক্ষ রেখা বলা হয়।” (In the words of J. R. Hicks, “It is the locus of the points representing pairs of quantities between which the individual is indifferent, and so it is termed an indifference curve.”)
২। অধ্যাপক লেফটউইচ (Richard H. Leftwich)-এর মতে, “একটি একক নিরপেক্ষ রেখা X এবং Y পণ্যের সেই বিভিন্ন সংমিশ্রণগুলো দেখায় যা একজন ভোক্তার কাছে সমান সন্তুষ্টি প্রদান করে।” (According to Prof. Leftwich, “A single indifference curve shows the different combinations of X and Y that yield equal satisfaction to the consumer.”)
৩। অধ্যাপক এ. কুৎসিয়ানিস (A. Koutsoyiannis)-এর মতে, “একটি নিরপেক্ষ রেখা হলো বিন্দুর এমন একটি সঞ্চারপথ যা দুটি পণ্যের সেই সকল সংমিশ্রণকে প্রতিনিধিত্ব করে, যে সংমিশ্রণগুলোর মধ্যে ভোক্তা নিরপেক্ষ থাকে।” (According to Prof. A. Koutsoyiannis, “An indifference curve is the locus of points which represent such combinations of two commodities among which the consumer is indifferent.”)
৪। অধ্যাপক সি. ই. ফার্গুসন (C. E. Ferguson)-এর মতে, “একটি নিরপেক্ষ রেখা হলো দুটি পণ্যের বিভিন্ন সংমিশ্রণের একটি সঞ্চারপথ, যা থেকে ভোক্তা সমান মোট সন্তুষ্টি লাভ করে।” (In the words of Prof. C. E. Ferguson, “An indifference curve is a locus of combinations of two goods, from which the consumer derives the same total satisfaction.”)
৫। হেডারসন ও কোয়ান্ট (Henderson & Quandt)-এর মতে, “নির্দিষ্ট পরিমাণ দুটি পণ্যের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন পছন্দের সেট যা থেকে ভোক্তা সমান উপযোগ লাভ করে, তাকে নিরপেক্ষ রেখা বলে।” (According to Henderson and Quandt, “The locus of all commodity bundles from which a consumer derives the same level of utility is called an indifference curve.”)
৬। অধ্যাপক এ. এল. বাউলি (A. L. Bowley)-এর ভাষায়, “নিরপেক্ষ রেখা দুটি ভিন্ন দ্রব্যের বিভিন্ন সংমিশ্রণ প্রকাশ করে, যা उपभोक्ताকে সমান সন্তুষ্টি প্রদান করে।” (In the words of Prof. A. L. Bowley, “An indifference curve shows different combinations of two commodities that give equal satisfaction to the consumer.”)
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি যে, নিরপেক্ষ রেখা হলো এমন একটি লেখচিত্র যা দুটি পণ্যের বিভিন্ন সংমিশ্রণ প্রকাশ করে, যেখানে প্রতিটি সংমিশ্রণ থেকে ভোক্তা সমান স্তরের উপযোগ বা সন্তুষ্টি লাভ করে এবং এই সংমিশ্রণগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সে উদাসীন বা নিরপেক্ষ থাকে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, নিরপেক্ষ রেখা ভোক্তার পছন্দ ও আচরণের একটি জ্যামিতিক উপস্থাপনা। এটি শুধুমাত্র তত্ত্বগতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বাস্তব জীবনে ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, চাহিদা নির্ধারণ এবং সরকারি নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এই রেখার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ভোক্তার উপযোগের মাত্রা পরিমাপ করা সম্ভব হয়, যা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দুটি পণ্যের যে সকল সংমিশ্রণ থেকে ভোক্তা সমান সন্তুষ্টি লাভ করে, তাদের নিয়ে অঙ্কিত সঞ্চারপথই হলো নিরপেক্ষ রেখা।
নিরপেক্ষ রেখা তত্ত্বের ধারণাটি প্রথম বিকাশ লাভ করে ফ্রান্সিস এজওয়ার্থের (Francis Edgeworth) হাত ধরে তার ১৮৮১ সালের “ম্যাথমেটিক্যাল সাইকিকস” গ্রন্থে। পরবর্তীতে ১৯০৬ সালে ভিলফ্রেডো পারেটো (Vilfredo Pareto) এই ধারণাকে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তবে, ১৯৩০-এর দশকে জে. আর. হিকস ও আর. জি. ডি. অ্যালেনের যৌথ প্রচেষ্টায় এই তত্ত্বটি জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ভোক্তার আচরণ বিশ্লেষণে একটি প্রভাবশালী তত্ত্বে পরিণত হয়।

