- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কতটা প্রগতিশীল, স্থিতিশীল এবং জনকল্যাণমুখী, তা বোঝার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো রাজনৈতিক উন্নয়ন। এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামোর গুণগত রূপান্তর। কোনো দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কতটা পরিপক্ব ও কার্যকর, তা কিছু সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি বা নির্ধারকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।
রাজনৈতিক উন্নয়নের নির্ধারকসমূহ:
১। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: রাজনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকা। ঘন ঘন সরকার পতন, সহিংসতা বা অরাজকতা কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে তোলে। যখন একটি দেশের সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়, তখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় হয়। এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
২। জনগণের অংশগ্রহণ: রাজনীতিতে সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং অবাধ অংশগ্রহণ রাজনৈতিক উন্নয়নের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। নাগরিকরা কেবল ভোট দিয়েই ক্ষান্ত থাকবে না, বরং নীতি নির্ধারণে তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ মানুষের প্রতিফলন ঘটলে শাসনব্যবস্থা আরও বেশি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। জনগণের এই অংশগ্রহণ সমাজ থেকে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব দূর করতে সাহায্য করে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
৩। আইনের শাসন: আইনের শাসন বলতে বোঝায় আইনের চোখে সবাই সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একটি উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শাসক ও শাসিত উভয়েই একই আইনের অধীন হয়ে থাকে। বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে এবং কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কাজ করতে পারে, তবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে এবং সমাজে স্বৈরাচারী মনোভাবের অবসান ঘটিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।
৪। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা: রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, সংসদ এবং আমলাতন্ত্রের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও সততার ওপর রাজনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ এবং স্বাবলম্বী হয়, তবে যেকোনো রাজনৈতিক সংকট সহজেই মোকাবেলা করা সম্ভব। দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে প্রশ্রয় দেয়, যা রাজনৈতিক উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। তাই প্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণ ও পেশাদারিত্ব অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
৫। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কুক্ষিগত না রেখে স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে হস্তান্তর করাই হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ নিজেদের শাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় এবং স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়। বিকেন্দ্রীকরণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করে তোলে। এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৬। রাজনৈতিক সংস্কৃতি: নাগরিকদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং আচরণের সমষ্টিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলা হয়। একটি সহনশীল, পরমতসহিষ্ণু এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সমাজে যখন ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে এবং হিংসাত্মক রাজনীতি বর্জনের মানসিকতা তৈরি হয়, তখন রাজনৈতিক পরিবেশ সুস্থ থাকে। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত সমাজ গঠনে নাগরিকদের দায়িত্বশীল করে তোলে।
৭। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: রাজনৈতিক উন্নয়নের সাথে অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা এবং প্রবৃদ্ধির একটি গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। একটি দেশের অর্থনীতি যত শক্তিশালী হবে, তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো তত বেশি স্বাধীন ও প্রভাবশালী হবে। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সম্পদের সুষম বণ্টন রাজনৈতিক ক্ষোভ ও অস্থিরতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ নাগরিকরা রাষ্ট্রের রাজনীতিতে আরও সচেতন এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়।
৮। সামাজিক ন্যায়বিচার: সমাজে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গভেদে সবার জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করাই হলো সামাজিক ন্যায়বিচার। যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক অনুভব করে যে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে না, তখন রাষ্ট্রীয় আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। সামাজিক ন্যায়বিচার না থাকলে সমাজে ক্ষোভ ও বিদ্রোহের জন্ম হয়, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে। তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা রাজনৈতিক উন্নয়নের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য মাপকাঠি।
৯। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বা রাজনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম সূচক বলা হয়। স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্নীতি জনসমক্ষে তুলে ধরে সরকারকে সঠিক পথে চলতে বাধ্য করে। এটি শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করলে রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক রূপ ধারণ করে, যা উন্নয়নের পরিপন্থী।
১০। সুশীল সমাজ: একটি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজ সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে। মানবাধিকার রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুশাসনের দাবিতে সুশীল সমাজ সবসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করে থাকে। তারা সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এবং সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করতে সাহায্য করে। একটি শক্তিশালী সুশীল সমাজের উপস্থিতি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সদা জাগ্রত ও জনমুখী রাখতে সহায়তা করে।
১১। জাতীয় ঐক্য: ভৌগোলিক, ধর্মীয় বা জাতিগত বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও দেশের নাগরিকদের মধ্যে সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য থাকা বাঞ্ছনীয়। যখন দেশের মানুষ নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে রাষ্ট্রের স্বার্থে একতাবদ্ধ হয়, তখন রাজনৈতিক উন্নয়ন সহজ হয়। অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা গৃহবিবাদ যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দিতে পারে। তাই একটি শক্তিশালী জাতি গঠন এবং রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য জাতীয় সংহতি অত্যন্ত জরুরি।
১২। দুর্নীতি প্রতিরোধ: দুর্নীতি হলো যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় বা বাধা। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্নীতিকে কঠোর হস্তে দমন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ বন্ধ হয়, তখন সাধারণ জনগণ সরাসরি সরকারি সেবার সুফল ভোগ করতে পারে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বস্ততা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
১৩। স্বাধীন নির্বাচন: একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রধানতম বহিঃপ্রকাশ। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ থাকলে জনগণের সার্বভৌমত্ব সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচনে কারচুপি বা অনিয়ম হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা সংকটের মুখে পড়ে এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। তাই একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা রাজনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
১৪। বৈদেশিক নীতি: একটি স্বাধীন, দূরদর্শী এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রাখা রাজনৈতিক দক্ষতার লক্ষণ। সফল কূটনীতি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা প্রাপ্তিতেও বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্ব রাজনীতিতে একটি দেশের অবস্থান তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উন্নয়নের স্তরকে নির্দেশ করে।
১৫। মানবাধিকার সুরক্ষা: রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার যেমন- জীবন ধারণের অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের এই অধিকারগুলো সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তখন রাজনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। তাই মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মানবিক রূপ প্রকাশ করে।
১৬। আমলাতান্ত্রিক পেশাদারিত্ব: দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বা আমলাদের দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং রাজনীতিমুক্ত থেকে জনসেবা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। আমলাতন্ত্র যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ না করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলে, তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি নীতি ও পরিকল্পনাগুলো মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত এই আমলাদের ওপরই ন্যস্ত থাকে। তাই আমলাতান্ত্রিক পেশাদারিত্ব ও সততা রাজনৈতিক উন্নয়নের একটি অন্যতম মূল স্তম্ভ।
১৭। শিক্ষা বিস্তার: একটি শিক্ষিত এবং সচেতন জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন থাকে। শিক্ষার হার বাড়লে নাগরিকরা সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করতে ভুল করে না এবং গুজবে কান দেয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর ফাঁপা প্রতিশ্রুতি ও আসল কাজের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা কেবল শিক্ষিত সমাজেরই থাকে। তাই শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, রাজনৈতিক উন্নয়ন কোনো একক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে হঠাৎ ঘটে না। এটি আইনের শাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি সমন্বিত রূপ। উল্লিখিত মাপকাঠিগুলোর সঠিক ও সুষম বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্র আদর্শ রাজনৈতিক উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে পারে। একটি উন্নত ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে এই নির্ধারকগুলোর চর্চা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য।