- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সামগ্রিক রূপান্তরই হলো উন্নয়ন। এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত ও টেকসই করার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও নীতি-নির্ধারকেরা বিভিন্ন সময়ে বৈচিত্র্যময় পথ বা কৌশল অবলম্বন করেছেন। মানবকল্যাণ ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে গৃহীত এই বিশেষ দিকনির্দেশনাগুলোই সমাজে ‘উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে পরিচিত।
উন্নয়ন মডেল বা কৌশলসমূহ
১। পুঁজিবাদী মডেল: এই কৌশলটি মূলত মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং ব্যক্তিগত মালিকানার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এখানে উৎপাদন, বণ্টন ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ থাকে না বললেই চলে। প্রতিযোগিতা ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই মডেলটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দ্রুত ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র এই মডেল অনুসরণ করে ব্যাপক শিল্পায়ন ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করেছে।
২। সমাজতান্ত্রিক মডেল: এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো সম্পদের সুষম বণ্টন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এখানে সমস্ত উৎপাদন উপাদান এবং সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা বজায় থাকে। ব্যক্তি মুনাফার চেয়ে সমষ্টিগত কল্যাণকে এই মডেলে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা কিউবার মতো রাষ্ট্রগুলো একসময় এই মডেলের ওপর ভিত্তি করেই তাদের অর্থনীতি পরিচালনা করেছিল।
৩৩। মিশ্র মডেল: পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের ইতিবাচক দিকগুলোর সমন্বয়ে এই বিশেষ উন্নয়ন কৌশলটি গঠিত হয়েছে। এখানে ব্যক্তি খাতের স্বাধীনতার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য সরকারি খাতের শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ, ভারতসহ পৃথিবীর বহু উন্নয়নশীল দেশ এই মডেলটি সফলভাবে অনুসরণ করে চলেছে। এটি একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।
৪। টেকসই উন্নয়ন: বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশ ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল এটি। এই মডেলটিতে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এটি অপচয় রোধ করে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নকে দারুণভাবে উৎসাহিত করে থাকে। বর্তমান বিশ্বে এই কৌশলটি সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একটি ধারণা।
৫। মানব উন্নয়ন: কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ধরা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জীবনধারণের মৌলিক অধিকারগুলোর সহজলভ্যতার ওপর এখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই মডেল মনে করে, মানবসম্পদ উন্নত হলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অর্জিত হবে। অমর্ত্য সেনের মতো নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদরা এই মডেলের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ও সমর্থক।
৬। রপ্তানি-মুখী মডেল: এই কৌশলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের পণ্যের আধিপত্য বিস্তার করাই এই মডেলের মূল উদ্দেশ্য। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং হংকংয়ের মতো দেশগুলো এই মডেল ব্যবহার করে দ্রুত উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে এই কৌশলের সুফল প্রতিনিয়ত ভোগ করছে।
৭। আমদানি-বিকল্প মডেল: বিদেশী পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই বিকল্প পণ্য উৎপাদনের কৌশলকে আমদানি-বিকল্প মডেল বলা হয়। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করাই এই মডেলের প্রধান উদ্দেশ্য। এই কৌশলের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র স্বনির্ভর হয়ে ওঠে এবং বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের প্রাথমিক শিল্পায়নের যুগে এই কৌশলটি বেশি ব্যবহার করে।
৮। ভারী শিল্পায়ন: এই উন্নয়ন কৌশলটিতে হালকা বা মাঝারি শিল্পের চেয়ে বড় ও ভারী শিল্প স্থাপনে বেশি জোর দেওয়া হয়। লোহা, ইস্পাত, বিদ্যুৎ এবং রাসায়নিক শিল্পের মতো খাতের প্রসার ঘটিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি মজবুত করা হয়। এই মডেলের মাধ্যমে দেশ দ্রুত শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। তবে এই কৌশল বাস্তবায়নে প্রচুর পুঁজি, সময় ও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়।
৯। কৃষিভিত্তিক মডেল: অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সার্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষিকে প্রাধান্য দেওয়ার কৌশল এটি। আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চ ফলনশীল বীজ এবং সারের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করা এই মডেলের লক্ষ্য। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কৌশল অতুলনীয়। এটি একদিকে যেমন দারিদ্র্য দূর করে, অন্যদিকে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
১০। ভারসাম্যহীন প্রবৃদ্ধি: এই কৌশলে দেশের সব খাতে একসাথে বিনিয়োগ না করে নির্দিষ্ট কিছু লাভজনক খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়। অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্ট হার্শম্যান এই তত্ত্বের প্রবক্তা, যেখানে অগ্রগামী খাতগুলো অন্য খাতকে টেনে তোলে। এই মডেলের মূল কথা হলো, একটি খাতের দ্রুত উন্নয়ন অন্যান্য অনুন্নত খাতকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করবে। সীমিত সম্পদের দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনার জন্য এই কৌশল বেশ কার্যকরী।
১১। ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি: ভারসাম্যহীন কৌশলের বিপরীত এই মডেলে অর্থনীতির সকল খাতে একসাথে সমপরিমাণ বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতকে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এর লক্ষ্য। রাগ্নার নার্ক্সের মতে, সব খাতের পারস্পরিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে বাজার বড় হয় এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই হয়। এই কৌশলটি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।
১২। অংশগ্রহণমূলক মডেল: সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কৌশল এটি। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে এই উন্নয়ন কাজ পরিচালিত হয়। এটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এনজিও এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই মডেল বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে।
১৩। অধোমুখী উন্নয়ন: এই মডেলটি বিশ্বাস করে যে, সমাজের উচ্চ স্তরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে তার সুফল ক্রমান্বয়ে নিচের স্তরে নেমে আসবে। বৃহৎ শিল্প ও ধনীদের ওপর কর ছাড় বা বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রথমে জাতীয় আয় বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে সেই ধনের প্রভাব সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়। যদিও এই কৌশলটি সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়াতে পারে বলে সমালোচনা রয়েছে।
১৪। উত্থানমুখী উন্নয়ন: অধোমুখী মডেলের ঠিক বিপরীত এই কৌশলে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নকে প্রথমে বিবেচনা করা হয়। ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং তৃণমূল শিক্ষার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করা হয় এর মূল লক্ষ্য। নিচ তলার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে তা সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে দারুণ অবদান রাখে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক বা ব্র্যাকের কার্যক্রম এই মডেলের চমৎকার কিছু বাস্তব উদাহরণ।
১৫। ডিজিটাল রূপান্তর: আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করার কৌশল এটি। ই-গভর্নেন্স, ফ্রিল্যান্সিং এবং ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের মাধ্যমে সেবার মান ও গতি বৃদ্ধি করা এর মূল লক্ষ্য। এই মডেলটি দুর্নীতি কমাতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে বিশাল ভূমিকা রাখে। বর্তমান যুগে যেকোনো দেশের দ্রুত ও আধুনিক উন্নয়নের জন্য এটি অপরিহার্য কৌশল।
১৬। আঞ্চলিক মডেল: দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট অনুন্নত অঞ্চলের বিশেষ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর কৌশল এটি। আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে এবং সুষম অর্থনৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করতে এই মডেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EPZ) বা অর্থনৈতিক করিডোর গঠন এই কৌশলের অন্যতম বড় উদাহরণ। এর মাধ্যমে গ্রামীণ বা পিছিয়ে পড়া জনপদ সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত হতে পারে।
১৭। সবুজ অর্থনীতি: পরিবেশের ক্ষতি না করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের আধুনিক কৌশলকে সবুজ অর্থনীতি বলা হয়। কার্বন নিঃসরণ কমানো, বনায়ন বৃদ্ধি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের ওপর এই মডেলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি পরিবেশ দূষণ রোধ করে মানব সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার পথকে সুগম ও নিরাপদ করে। বর্তমান বিশ্বের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই কৌশলটি অত্যন্ত সমাদৃত ও কার্যকরী।
১৮। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি: উৎপাদন ও সেবামূলক খাতে শারীরিক শ্রমের চেয়ে মেধা, উদ্ভাবন ও গবেষণাকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহারের কৌশল এটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য প্রযুক্তি এবং উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে এই মডেলের মূল কাঠামো গড়ে তোলা হয়। এই কৌশলের মাধ্যমে কম সম্পদ ব্যবহার করেও বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা সম্ভব হয়। উন্নত বিশ্ব বর্তমানে এই মডেলের ওপর ভিত্তি করেই তাদের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে।
শেষকথা: উন্নয়নের কোনো একক বা নির্দিষ্ট মডেল সব দেশের জন্য সমানভাবে কার্যকর হতে পারে না। একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, সম্পদ এবং সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই সঠিক উন্নয়ন কৌশলটি নির্বাচন করতে হয়। বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও মানবকল্যাণমুখী কৌশলের সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। সব মডেলের ইতিবাচক দিকগুলোর সঠিক প্রয়োগই একটি রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যেতে পারে।