- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি বৈচিত্র্যময় ও বিশাল জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির নিজস্ব পথই হলো ‘ভারতের উন্নয়ন মডেল’। বিশ্বায়নের যুগে নিজস্ব শক্তি, দেশীয় সম্পদ এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ভারত আজ বিশ্বের বুকে এক উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি। স্বনির্ভরতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই মডেল।
১। ডিজিটাল বিপ্লব: ভারত অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তার শাসনব্যবস্থা এবং নাগরিক পরিষেবাতে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষও এখন মুহূর্তের মধ্যে ক্যাশলেস লেনদেন করতে পারছেন। আধার কার্ড এবং ডিজিটাল ইন্ডিয়া অভিযানের ফলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা সরাসরি জনগণের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২। আত্মনির্ভরশীলতা: নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ভারত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযান শুরু করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের মাটিতেই প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করা। প্রতিরক্ষা খাত থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন উৎপাদন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই নীতি দেশের যুবসমাজের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করে তুলছে।
৩। অবকাঠামো উন্নয়ন: যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য ভারত সরকার রেকর্ড গতিতে পরিকাঠামো নির্মাণ করে চলেছে। ‘গতি শক্তি’ জাতীয় মাস্টার প্ল্যানের অধীনে দেশজুড়ে আধুনিক মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে এবং উন্নত রেলওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোর আধুনিকীকরণের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শক্তিশালী পরিকাঠামোই বর্তমান ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
৪। সবুজ শক্তি: জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদনে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে। সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সৌর জোট গঠনের মাধ্যমে ভারত এই খাতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্য নিয়ে পরিবেশবান্ধব এক টেকসই ভবিষ্যৎ মডেল তৈরি করছে দেশটি।
৫। স্টার্টআপ সংস্কৃতি: বর্তমান ভারতের উন্নয়ন মডেলের অন্যতম বড় একটি স্তম্ভ হলো তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তি ও উদ্যোক্তা মানসিকতা। সরকারি নীতি ও সহজ ঋণের কল্যাণে দেশজুড়ে হাজার হাজার নতুন স্টার্টআপ ব্যবসা গড়ে উঠছে। বিশ্বের মধ্যে ভারত এখন তৃতীয় বৃহত্তম স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই নতুন উদ্যোগগুলো কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করছে না, বরং লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান করছে।
৬। নারী ক্ষমতায়ন: সমাজের অর্ধেক জনসংখ্যাকে পেছনে ফেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন যে অসম্ভব, তা ভারত ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছে। ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ এবং ‘মুদ্রা যোজনা’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের শিক্ষা ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা আজ ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করছেন। রাজনীতি থেকে শুরু করে মহাকাশ বিজ্ঞান, সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে।
৭। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: দেশের প্রতিটি নাগরিককে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার জন্য ‘জন ধন যোজনা’র মতো ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ জীবনের প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পেয়েছেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি ভরতুকির টাকা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি গরিব মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। আর্থিক খাতের এই সমতা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও গতিশীল করেছে।
৮। কৃষি আধুনিকীকরণ: বিশাল জনসংখ্যার এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতের আধুনিকীকরণকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ‘পিএম কিষাণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং সয়েল হেলথ কার্ডের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সেচ ব্যবস্থার উন্নতি এবং জৈব চাষের প্রসারে সরকার নানামুখী ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে।
৯। স্বাস্থ্যসেবা প্রসার: দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে সুলভ মূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এই মডেলের অন্যতম লক্ষ্য। ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পের আওতায় কোটি কোটি দরিদ্র পরিবারকে বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য বিমা দেওয়া হচ্ছে। দেশজুড়ে হাজার হাজার জন ঔষধি কেন্দ্র স্থাপন করে অত্যন্ত কম মূল্যে জেনেরিক ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাক্ষেত্রের এই সামাজিক নিরাপত্তা সাধারণ মানুষের পকেটের খরচের বোঝা অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে।
১০। শিক্ষা সংস্কার: একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত তার পুরনো শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ চালু করেছে। এই নতুন নীতিতে মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে দক্ষতা উন্নয়ন এবং সৃজনশীলতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক মানদণ্ড অর্জনের লক্ষ্যে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসন ও গবেষণার সুযোগ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
১১। রপ্তানি বৃদ্ধি: ভারত ঐতিহ্যগত আমদানিকারক দেশের তকমা মুছে এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠছে। তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, ওষুধ সামগ্রী, রত্ন অলঙ্কার এবং প্রকৌশল পণ্য বিশ্বের বাজারে বিপুল পরিমাণে রপ্তানি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষরের মাধ্যমে নতুন বাজার খোঁজা হচ্ছে। দেশীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে সরকার উৎপাদন-ভিত্তিক প্রণোদনা বা পিএলআই স্কিম চালু করেছে।
১২। গ্রামীণ বিকাশ: শহরের পাশাপাশি গ্রামের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রুurban মিশন’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা’ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। গ্রামের কাঁচা রাস্তাগুলোকে পাকা সড়কে রূপান্তর করে শহরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্প দ্রুত গতিতে চলছে। গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়ায় শহরের সুবিধা এখন গ্রামেই পাওয়া যাচ্ছে।
১৩। পণ্য উৎপাদন: ভারতকে বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা পণ্য উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে। চীন-প্লাস-ওয়ান নীতির সুবিধা নিয়ে বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি এখন ভারতে কারখানা স্থাপন করছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স এবং অটোমোবাইল শিল্পে ভারত অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছে। কর ব্যবস্থার সরলীকরণ এবং ব্যবসার সহজিকরণ নীতি উৎপাদন খাতকে আরও বেশি চাঙ্গা করে তুলেছে।
১৪। মহাকাশ বিজ্ঞান: অত্যন্ত সীমিত খরচে মহাকাশ গবেষণায় ভারতের সাফল্য আজ পুরো বিশ্বের কাছে এক পরম বিস্ময়। ‘ইসরো’ (ISRO) তার চন্দ্রযান এবং মঙ্গলযান অভিযানের মাধ্যমে ভারতের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে ভারত আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাচ্ছে। এই মহাকাশ বিপ্লব দেশের তরুণদের বিজ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক দিক থেকেও লাভজনক হচ্ছে।
১৫। ট্যুরিজম ব্র্যান্ডিং: ভারতের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্পকে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’ বা ‘অতুল্য ভারত’ অভিযানের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ভারতের পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পর্যটনের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে মেডিকেল ট্যুরিজমের কেন্দ্র হিসেবে ভারত বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পর্যটন খাতের এই বিকাশ দেশের হোটেল, পরিবহন ও স্থানীয় হস্তশিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটাচ্ছে।
১৬। আঞ্চলিক ভারসাম্য: দেশের কোনো অংশ যেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে না থাকে, সেজন্য ভারত আঞ্চলিক ভারসাম্যের ওপর জোর দিচ্ছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর উন্নয়নের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন ও পরিকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। অনগ্রসর জেলাগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মান বাড়ানোর জন্য বিশেষ কর্মসূচি চলছে। এই সুষম উন্নয়ন নীতি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব এবং জাতীয় সংহতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
১৭। কূটনৈতিক প্রভাব: ভারতের অর্থনৈতিক শক্তির বিকাশ তার বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রভাবকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বহুপাক্ষিক ফোরাম যেমন জি-২০, ব্রিকস এবং কোয়াড-এ ভারত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নীতি নির্ধারণী ভূমিকা পালন করছে। বৈশ্বিক সংকটের সময়ে বিশ্বের দরবারে ভারত আজ গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ভারতের এই শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সাহায্য করছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ভারতের উন্নয়ন মডেল কেবল জিডিপি বৃদ্ধির অন্ধ দৌড় নয়, বরং এটি হলো মানবকল্যাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক সুষম সমন্বয়। নানা চ্যালেঞ্জ ও অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রেখে ভারতের এই অর্থনৈতিক উত্থান সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, পরিকাঠামোগত সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি আগামী দিনে ভারতকে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিতে পরিণত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।