- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তঝরা অধ্যায়। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। এই আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল পাকিস্তানি শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম দীপ্তিময় স্ফুলিঙ্গ।
ভাষা আন্দোলনের বিবরণ:
১। ঐতিহাসিক পটভূমি: ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অংশ নিয়ে এই অদ্ভুত রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়। এর প্রথম আঘাতটি আসে আমাদের পরম প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার ওপর।
২। ভাষার গুরুত্ব: ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন এবং সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। একটি জাতির অস্তিত্ব ও পরিচয় তার মাতৃভাষার ওপর গভীরভাবে নির্ভর করে। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির এই মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তখন বাংলার মানুষ তা মেনে নিতে পারেনি। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই বাঙালিরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে।
৩। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব: ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো দাবি জানান। তিনি যুক্তি দেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হিসেবে বাংলাকে অবহেলা করা চরম অন্যায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার এই ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত দাবিটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
৪। ছাত্রদের প্রতিবাদ: ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব নাকচ হওয়ার খবর ঢাকায় পৌঁছালে ছাত্রসমাজ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, শুরুতেই প্রতিবাদ না করলে বাঙালি জাতি চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্লাস বর্জন করে এবং রাজপথে নেমে আসে। এভাবেই ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক ভিত্তি এবং প্রথম গণবিক্ষোভের সূচনা ঘটেছিল।
৫। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ: আন্দোলনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সর্বদলীয় এই পরিষদ গঠনের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন একটি সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। এর ফলে ছাত্র, যুবসমাজ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে একটি চমৎকার সমন্বয় তৈরি হয়। তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে দেশব্যাপী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
৬। জিন্নাহর ঘোষণা: ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন। রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি অত্যন্ত অহংকারী ভাষায় বক্তৃতা দেন। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। তার এই স্বৈরাচারী ঘোষণা বাঙালি ছাত্রসমাজকে তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত করে।
৭। না-না ধ্বনি: জিন্নাহর সেই অন্যায় ঘোষণার সাথে সাথেই সমাবর্তন স্থলে উপস্থিত ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা সমস্বরে ‘না-না’ ধ্বনি তুলে জিন্নাহর মুখের ওপর নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করে। একজন সর্বশক্তিমান শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে এমন প্রতিবাদ করা ছিল অত্যন্ত সাহসী একটি পদক্ষেপ। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, বাঙালিরা তাদের ভাষার প্রশ্নে কখনো আপস করবে না।
৮। আন্দোলনের বিস্তার: ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলন শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ধীরে ধীরে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার এই লড়াই তখন একটি গণআন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করে।
৯। লিয়াকত আলীর বক্তব্য: ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় আসেন। পল্টন ময়দানের এক জনসভায় তিনি জিন্নাহর কথারই পুনরাবৃত্তি করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। তার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছিল। এর ফলে পূর্ব বাংলায় নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ও গণবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়।
১০। সর্বদলীয় সভা: খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিবাদে ১৯NT সালের ৩০ জানুয়ারি একটি সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে পুনরায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠন করা হয়। এই সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে। এই কর্মসূচি সফল করতে ছাত্ররা ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
১১। ১৪৪ ধারা জারি: ২১শে ফেব্রুয়ারির সাধারণ ধর্মঘট ও সমাবেশকে নস্যাৎ করার জন্য সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। এর ফলে যেকোনো ধরনের সভা, সমাবেশ এবং মিছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারের এই দমনমূলক সিদ্ধান্তের ফলে ঢাকার পরিবেশ অত্যন্ত থমথমে এবং উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে। কিন্তু ছাত্ররা সরকারের এই অন্যায় নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
১২। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ: ২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১০ জন করে মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছাত্ররা অত্যন্ত শৃঙ্খলা ও সাহসের সাথে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রাজপথে নেমে আসে। তাদের কণ্ঠে তখন একটাই স্লোগান ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।
১৩। পুলিশের গুলিবর্ষণ: মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন পুলিশ অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা চালায়। শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। এক পর্যায়ে নিষ্ঠুর পাকিস্তানি পুলিশ সরাসরি মিছিলের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। রাজপথ মুহূর্তের মধ্যে বাংলার তরতাজা যুবকদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে।
১৪। শহীদদের আত্মত্যাগ: পুলিশের সেই বর্বরোচিত গুলিবর্ষণে রফিক উদ্দিন, আবদুল জব্বার এবং আবুল বরকত ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি শফিউর রহমানসহ আরও অনেকেই ভাষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য পৃথিবীতে এটিই ছিল প্রথম বুকের রক্ত দেওয়ার ঘটনা। এই মহান শহীদদের আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৫। শহীদ মিনার নির্মাণ: শহীদদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্ররা একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে অতি দ্রুততার সাথে প্রথম শহীদ মিনারটি তৈরি করা হয়। ২৪শে ফেব্রুয়ারি শহীদ শফিউরের পিতা এই মিনারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এটি হয়ে ওঠে বাঙালি জাতির প্রেরণা এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।
১৬। অনন্য স্বীকৃতি: ১৯৫২ সালের রক্তক্ষয়ী এই আন্দোলনের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়। ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এটি ছিল বাঙালির প্রথম মহান রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিজয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ন্যায়ের লড়াইয়ে কখনো পরাজয় হয় না।
১৭। আন্তর্জাতিক দিবস: ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলাদেশের ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ২০০০ সাল থেকে সারা পৃথিবীতে এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধার সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাঙালির ভাষার লড়াই আজ বিশ্বের সকল বিলুপ্তপ্রায় ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষার প্রেরণা। এটি বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরব ও সম্মানের একটি বিষয়।
শেষকথা: ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম সফল সোপান। এই আন্দোলনের চেতনা থেকেই পরবর্তীকালে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। একুশের রক্তক্ষয়ী চেতনা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। শহীদদের রক্তে ভেজা এই বাংলা ভাষাকে বুকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে সম্মুখ পানে।