- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত প্রভাববিস্তারী ও সুদূরপ্রসারী। সবকটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি দেশের শাসনব্যবস্থা, উন্নয়নচিত্র এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে এক যুগান্তকারী ও অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল ও গুরুত্বের মূল দিকসমূহ:
১। নির্বাচনী ফলাফল: এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল ভোটে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয় পেয়ে তারা সরকার গঠন করে। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৭টি আসনে জয়ী হতে সক্ষম হয়। এই বিশাল ব্যবধান দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করে।
২। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: নির্বাচনের এই একমুখী ফলাফল দেশে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রধান ভূমিকা রাখে। পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা বা হরতাল-অবরোধের সংস্কৃতি অনেকটাই কমে আসে। ফলে সরকার কোনো ধরনের বড় রাজনৈতিক বাধা ছাড়াই তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করার সুযোগ পায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় এক ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
৩। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা: টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বড় বড় কাঠামোগত প্রজেক্টগুলো গতিশীল হয়। সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন অভূতপূর্ব গতি পায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে।
৪। নেতৃত্বের সুদৃঢ়করণ: এই নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশ ও বিদেশে আরও সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয়। তিনি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে এক অনন্য ইতিহাস গড়েন। দলের অভ্যন্তরে এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরেন।
৫। বিরোধীদলের বিপর্যয়: নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের চরম বিপর্যয় ঘটে। আসন সংখ্যার দিক থেকে তারা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এই ফলাফলের ফলে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা ও স্থবিরতা নেমে আসে। দীর্ঘদিন ধরে তারা জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর কোনো প্রভাব বা চাপ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
৬। মহাজোটের আধিপত্য: নির্বাচনের পর সংসদে এবং মাঠের রাজনীতিতে মহাজোটের একক আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের আসন সংখ্যা অতি সামান্য হওয়ায় সংসদে কোনো বিষয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। ফলে যেকোনো বিল বা আইন পাসের ক্ষেত্রে সরকারি দল একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়। রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি একতরফা হয়ে পড়ে।
৭। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গিয়ে পড়ে। জিডিপি বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হতে থাকে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হওয়ায় নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার পথ সুগম হয়। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
৮। উদারপন্থী পররাষ্ট্রনীতি: নির্বাচনের পর সরকার অত্যন্ত সফলভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও উদারপন্থী পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে এগিয়ে চলে। ভারত, চীন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর সাথে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে সমর্থ হয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে আরও উজ্জ্বল ও সুসংহত হয়ে ওঠে। বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
৯। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তর: এই নির্বাচনের পর তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সরকার আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পায়। দেশের প্রতিটি প্রান্তে ইন্টারনেট সেবা এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোর কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়। ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যাংকিং এবং ই-গভর্নেন্সের ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজতর হয়ে ওঠে। এর ফলে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যটি দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।
১০। সামাজিক নিরাপত্তা: গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, পঙ্গু ভাতা এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়ে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ধরনের সাফল্য আসে। প্রান্তিক মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ সহজতর হয়।
১১। যুবসমাজের কর্মসংস্থান: তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। তবে বিশাল যুবগোষ্ঠীর প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও রয়ে যায়।
১২। আইনসভার চরিত্র: একাদশ সংসদের চরিত্র পূর্বের যেকোনো সংসদের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন রূপ লাভ করে। সরকারি দলের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত ও সহজ হয়ে যায়। তবে শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে সংসদের প্রাণবন্ত বিতর্ক অনেকটাই হারিয়ে যায়। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।
১৩। ভোটার উপস্থিতি: এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার চিত্রটি ছিল বেশ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ওঠায় ভোটের উৎসবমুখর পরিবেশে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সামগ্রিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে মিশ্র অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয়।
১৪। আঞ্চলিক উন্নয়ন: সরকারের ধারাবাহিকতার কারণে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত ও আঞ্চলিক এলাকাগুলোর উন্নয়নে ব্যাপক গতি আসে। প্রতিটি জেলায় রাস্তাঘাট, কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আধুনিকায়ন করা হয়। গ্রামীণ অবকাঠামোর এই আমূল পরিবর্তনের ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য অনেকটাই কমে আসে। প্রান্তিক মানুষ সরাসরি এই উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে শুরু করে।
১৫। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: নির্বাচনের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানায়। কূটনৈতিক স্তরে সরকারের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় কোনো সংকট তৈরি হয়নি। তবে কিছু পশ্চিমা দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় বাধা হতে পারেনি। ফলে বৈদেশিক সাহায্য ও বাণিজ্য স্বাভাবিক গতিতেই চলতে থাকে।
১৬। নতুন নেতৃত্ব: এই নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভা গঠনে এক বড় ধরনের চমক ও পরিবর্তন দেখা যায়। প্রবীণ অনেক নেতাকে বাদ দিয়ে একঝাঁক তরুণ ও নতুন মুখকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে প্রশাসনের কাজে নতুন গতি ও উদ্দীপনা তৈরি হয়। নতুন প্রজন্মের নেতাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদী অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ সুগম হয়।
১৭। ভবিষ্যৎ রাজনীতি: ২০১৮ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির মেরুকরণে এক স্থায়ী পরিবর্তন এনে দেয়। ঐতিহ্যগত দ্বি-দলীয় ধারার রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এক-দলীয় আধিপত্যের সূচনা ঘটে। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিরোধী দলগুলোর টিকে থাকার সংগ্রাম আগামী দিনের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। এই নির্বাচনের ফলাফল একদিকে যেমন দেশে দৃশ্যমান মেগা উন্নয়ন ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের গণতান্ত্রিক বহুমাত্রিকতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনটি বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।