- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের সামগ্রিক ও সুষম উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো সঠিক জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। সম্পদ, তথ্য ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে একটি বাস্তবমুখী ও ত্রুটিহীন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি করতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সমস্যাগুলো:
১। সঠিক তথ্যের অভাব: যেকোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত। কিন্তু আমাদের দেশে সঠিক ও পর্যাপ্ত পরিসংখ্যানের চরম ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, মাঠ পর্যায় থেকে সংগৃহীত উপাত্তে প্রচুর ভুলত্রুটি থাকে। ফলে ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা পরিকল্পনাগুলো পরবর্তীতে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। সঠিক তথ্যের অভাব দূর করা না গেলে দেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২। সম্পদের সীমাবদ্ধতা: পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তীব্র মূলধন ও সম্পদের স্বল্পতা। একটি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সম্পদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের জাতীয় রাজস্ব আয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হয়। প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত না করে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিলে তা মাঝপথে আটকে যায়। তাই সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদার সমন্বয় ঘটানো অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।
৩। দক্ষ জনবলের ঘাটতি: একটি কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরির জন্য উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ দলের প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে পারদর্শী দক্ষ জনশক্তির যথেষ্ট অভাব রয়েছে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ না থাকায় পরিকল্পনাবিদরা বৈশ্বিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেন না। দক্ষ মানবসম্পদের এই অভাবের কারণে পরিকল্পনার গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না। ফলশ্রুতিতে নকশাগত ত্রুটির কারণে অনেক ভালো প্রকল্পও আলোর মুখ দেখে না।
৪। রাজনৈতিক অস্থিরতা: জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদী হলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে তা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া অনেক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হুট করে বন্ধ বা পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নীতি নিয়ে কোনো ঐক্যমত্য না থাকায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। এই ধরনের অস্থির পরিবেশের কারণে অর্থনৈতিক খাতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলো অপূর্ণ থেকে যায়।
৫। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: পরিকল্পনা কমিশন থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় সমস্যা। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে যেকোনো নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফলে প্রকল্পের ব্যয় যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি তার কার্যকারিতাও অনেকখানি কমে যায়। ফলে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়ে।
৬। ব্যাপক দুর্নীতি: অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বরাদ্দ দেওয়ার স্তরে স্তরে দুর্নীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প তৈরি করা হয়। অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে প্রকল্পের বাজেট কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে ধরা হয়, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। দুর্নীতির কারণে সঠিক খাতে অর্থ বরাদ্দ না হয়ে অপচয় হয় এবং প্রকৃত উন্নয়ন থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়। এটি পরিকল্পনা প্রণয়নের অন্যতম বড় একটি অন্তরায়।
৭। বৈদেশিক নির্ভরতা: আমাদের দেশের অধিকাংশ বড় উন্নয়ন প্রকল্পই বিদেশি ঋণ, অনুদান এবং দাতাগোষ্ঠীর সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এই অতিরিক্ত বৈদেশিক নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় নিজস্ব শর্ত ও এজেন্ডা চাপিয়ে দেয়। অনেক সময় এই শর্তগুলো আমাদের দেশের স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা কল্যাণকর হয় না। ফলে নিজেদের স্বাধীন নীতি অনুযায়ী দেশের জন্য প্রয়োজনীয় ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হয় না।
৮। উপাত্তের অসঙ্গতি: বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্যের মধ্যে প্রায়ই বড় ধরনের অমিল খুঁজে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা দারিদ্র্যের হার নিয়ে একেক দপ্তর একেক রকম পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। পরিকল্পনাবিদরা যখন কাজ শুরু করেন, তখন কোন তথ্যটিকে সঠিক বলে ধরে নেবেন তা নিয়ে চরম বিভ্রান্তিতে পড়েন। এই জাতীয় উপাত্তের অসঙ্গতির কারণে তৈরি হওয়া পরিকল্পনাগুলো বাস্তবতার চেয়ে কাল্পনিক ও কাগজে-কলমে বেশি সীমাবদ্ধ থাকে।
৯। সমন্বয়ের অভাব: পরিকল্পনা প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোর সাথে বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজের কোনো সুনির্দিষ্ট সমন্বয় থাকে না। একটি রাস্তা তৈরির পর অন্য একটি দপ্তর এসে তা গ্যাস বা পানির লাইনের জন্য কেটে ফেলে। এই ধরনের সমন্বয়হীনতার মূল কারণ হলো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় সব অংশীজনকে এক টেবিলে না আনা। পারস্পরিক যোগাযোগ ও জবাবদিহিতার অভাবে কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে এবং জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে।
১০। মূল্যস্ফীতির চাপ: দেশের বাজারে ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা মূল্যস্ফীতি পরিকল্পনা প্রণয়নকে কঠিন করে তোলে। একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের বাজেট যখন তৈরি করা হয়, তখন বর্তমান বাজার দর হিসাব করা হয়। কিন্তু প্রকল্প শেষ হতে হতে কাঁচামাল ও শ্রমের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যস্ফীতির কারণে পরবর্তীতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হয়, যা মূল বাজেটের ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না।
১১। জনগণের অংশগ্রহণের অভাব: আমাদের দেশে অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো সাধারণত উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো মতামত থাকে না। স্থানীয় জনগণের প্রকৃত চাহিদা কী, তা না জেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নীতি নির্ধারণ করা হয়। ফলে তৈরি হওয়া পরিকল্পনাগুলো তৃণমূল মানুষের বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মতামত ছাড়া কোনো জাতীয় পরিকল্পনা কখনোই পূর্ণাঙ্গ ও সফল হতে পারে না।
১২। প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মুখোমুখি হতে হয়। এই আচমকা প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানে। দুর্যোগের পর জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য মূল উন্নয়ন বাজেট থেকে অর্থ ডাইভার্ট বা সরিয়ে নিতে হয়। এর ফলে চলমান অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কাজ থমকে দাঁড়ায় এবং বার্ষিক পরিকল্পনা পুনর্নির্ধারণ করতে হয়।
১৩। ত্রুটিপূর্ণ বাস্তবায়ন: অনেক সময় চমৎকার একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চরম গাফিলতি দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়াতে হয়। এতে করে জনগণের করের টাকার অপচয় হয় এবং যথাসময়ে প্রকল্পের সুফল পাওয়া যায় না। দুর্বল তদারকি এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে ভালো পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
১৪। আঞ্চলিক বৈষম্য: পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় অনেক ক্ষেত্রে দেশের নির্দিষ্ট কিছু উন্নত অঞ্চলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর ফলে অনগ্রসর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত ও উন্নয়নবঞ্চিত থেকে যায়। সুষম জাতীয় উন্নয়নের জন্য দেশের সব অঞ্চলের সমান অগ্রগতি প্রয়োজন, যা অনেক সময়ই নিশ্চিত করা হয় না। এই আঞ্চলিক দূরত্বের কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
১৫। বৈশ্বিক মন্দা: বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে আন্তর্জাতিক বাজারের যেকোনো মন্দা পরিস্থিতি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। যুদ্ধ, মহামারী বা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধরনের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আগে থেকে নিখুঁতভাবে অনুমান করা পরিকল্পনাবিদদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলস্বরূপ, বিশ্ব অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাবে দেশীয় পরিকল্পনার অনেক লক্ষ্যমাত্রাই অধরা থেকে যায়।
১৬। প্রযুক্তির দুর্বলতা: আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দ্রুত ও নিখুঁত করার জন্য উন্নত সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের দেশের পরিকল্পনা বিভাগগুলোতে এখনো সনাতন ও অ্যানালগ পদ্ধতির ওপর বেশি নির্ভর করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না থাকায় যেকোনো বিশ্লেষণ করতে প্রচুর সময় লেগে যায়। তথ্য প্রযুক্তির এই অনগ্রসরতা আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে অনেক পিছিয়ে রাখছে।
১৭। অগ্রাধিকার নির্ধারণের ভুল: অনেক সময় দেশের প্রকৃত চাহিদাকে মূল্যায়ন না করে রাজনৈতিক বা আবেগীয় কারণে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যেখানে শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে হয়তো কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসিতা করা হচ্ছে। এই অগ্রাধিকার নির্ধারণের ভুলের কারণে সীমিত সম্পদের অপচয় ঘটে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সঠিক খাতের চেয়ে ভুল খাতে মনোযোগ দেওয়া পরিকল্পনা প্রণয়নের বড় ত্রুটি।
১৮। আইনি সীমাবদ্ধতা: আমাদের দেশে প্রচলিত অনেক অর্থনৈতিক আইন ও বিধিমালা বেশ পুরোনো এবং বর্তমান যুগের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রাচীন আইনি জটিলতার কারণে নতুন ও যুগোপযোগী কোনো প্রকল্প দ্রুত পাস বা বাস্তবায়ন করা যায় না। তাছাড়া আমলাতান্ত্রিক বিভিন্ন নীতিমালার মারপ্যাঁচে পড়ে অনেক ভালো উদ্যোগ মাঝপথে ভেস্তে যায়। যুগোপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব আইনি সংস্কারের অভাবে পরিকল্পনা প্রণয়নের গতিশীলতা হারিয়ে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের এই সমস্যাগুলো দেশের অগ্রগতির পথকে মসৃণ হতে দিচ্ছে না। তবে সঠিক নেতৃত্ব, দূরদর্শী চিন্তাভাবনা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, দক্ষ জনবল সৃষ্টি এবং তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে পারলে একটি নিখুঁট ও সফল পরিকল্পনা তৈরি করা যাবে। তবেই দেশ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করবে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারবে।