- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক নৈকট্য থাকলেও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সংগঠনটি প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
সার্কের পরিচয় ও উদ্দেশ্য
সার্কের পূর্ণরূপ হলো South Asian Association for Regional Cooperation। ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় এর সনদ স্বাক্ষরিত হয়। সার্কের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো।archive
বর্তমানে সার্কের সদস্যদেশ হলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান। আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব সার্কের কার্যক্রমকে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত করছে।
সার্কের সফলতা
১। আঞ্চলিক মঞ্চ: সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি নিয়মিত আঞ্চলিক মঞ্চ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর সরকার ও প্রতিনিধিরা অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছে। আগে যেসব বিষয় দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকত, সার্ক সেগুলোকে আঞ্চলিক আলোচনার আওতায় এনেছে।
২। পারস্পরিক যোগাযোগ: সার্ক প্রতিষ্ঠার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও সদস্যদেশগুলো একই টেবিলে বসে অভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে পেরেছে। এই যোগাযোগ পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি কমাতে এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
৩। সামাজিক সহযোগিতা: দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, অপুষ্টি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সার্ক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সামাজিক সনদে দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী উন্নয়ন ও শিশুকল্যাণের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে এসব সমস্যা আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।lotusarise
৪। সার্ক খাদ্যব্যাংক: খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সার্ক খাদ্যব্যাংক প্রতিষ্ঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কোনো সদস্যদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা খাদ্যঘাটতির মুখে পড়লে আঞ্চলিক খাদ্য মজুত থেকে সহায়তা দেওয়ার ধারণা তৈরি হয়। যদিও এর বাস্তব প্রয়োগ সীমিত, তবু এটি সম্মিলিত নিরাপত্তা ও মানবিক সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
৫। সার্ক উন্নয়ন তহবিল: আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে সার্ক উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়। সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতায় এই তহবিল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নের বৈষম্য কমাতে এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
৬। সাফটা চুক্তি: দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য South Asian Free Trade Area বা সাফটা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। এর মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে শুল্ক কমানো এবং বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। বাস্তবে অনেক বাধা থাকলেও আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্যের ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সার্কের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
৭। শিক্ষা সহযোগিতা: সার্ক বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী বিনিময়, গবেষণা সহযোগিতা ও বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সদস্যদেশগুলোর শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠায় জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে আঞ্চলিক বন্ধুত্ব গড়ে তুলতেও এ উদ্যোগ সহায়ক।
৮। স্বাস্থ্য সহযোগিতা: সংক্রামক রোগ, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু এবং জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সার্ক সদস্যদেশগুলো তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়। মহামারি মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের ধারণা সার্কের মানবিক গুরুত্বকে প্রকাশ করেছে।
৯। সাংস্কৃতিক সম্পর্ক: সার্ক সাংস্কৃতিক উৎসব, শিল্পী বিনিময়, সাহিত্যিক অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের সংস্কৃতি, ভাষা, খাবার, সংগীত ও ঐতিহ্যের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। এসব মিলকে কাজে লাগিয়ে সার্ক পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও আঞ্চলিক পরিচয় গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
১০। সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগ: সন্ত্রাসবাদ, মাদকপাচার, মানবপাচার ও আন্তদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় সার্ক বিভিন্ন চুক্তি ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করেছে। সদস্যদেশগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল, তবু সমস্যা মোকাবিলায় সম্মিলিত কাঠামো তৈরি হয়েছে।
১১। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: দক্ষিণ এশিয়া বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, সুনামি ও ভূমিধসপ্রবণ অঞ্চল। সার্ক দুর্যোগ মোকাবিলা, আবহাওয়া তথ্য বিনিময়, উদ্ধারকাজ ও পুনর্বাসনে আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এক দেশের দুর্যোগের প্রভাব অন্য দেশে পড়তে পারে—এই উপলব্ধি জোরদার হয়েছে।
সার্কের ব্যর্থতা
১২। রাজনৈতিক বিরোধ: সার্কের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার কারণ ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিরোধ। কাশ্মীর সমস্যা, সীমান্ত উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস সার্কের সম্মেলন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। দুই বৃহৎ সদস্যদেশের বিরোধের প্রভাব পুরো সংগঠনের কার্যক্রমে পড়েছে।
১৩। শীর্ষ সম্মেলন স্থবির: সার্কের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন ২০১৪ সালের ২৬–২৭ নভেম্বর নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সালে পাকিস্তানে নির্ধারিত ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং এরপর আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে সার্কের রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।news.abplive+1
১৪। ঐকমত্যের বাধা: সার্কের সিদ্ধান্ত সাধারণত সব সদস্যের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। এই নীতি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ন্যায্য মনে হলেও রাজনৈতিক বিরোধের সময় এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি বা দুটি দেশ আপত্তি জানালেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে যায়। ফলে জরুরি আঞ্চলিক সমস্যায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না।thefederal
১৫। দুর্বল বাস্তবায়ন: সার্কের বিভিন্ন চুক্তি, পরিকল্পনা ও ঘোষণা থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন খুব ধীর। সদস্যদেশগুলো অনেক সময় চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও নিজ নিজ দেশে প্রয়োজনীয় আইন, অবকাঠামো বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। ফলে সিদ্ধান্ত কাগজে থাকে, সাধারণ মানুষ তার সুফল পায় না।
১৬। কম আঞ্চলিক বাণিজ্য: ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য তুলনামূলকভাবে কম। উচ্চ শুল্ক, অশুল্ক বাধা, দুর্বল যোগাযোগ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করেছে। এতে সার্কের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগেনি।
১৭। ভারত-পাকিস্তান নির্ভরতা: সার্কের কার্যকারিতা অনেকাংশে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক ভালো থাকলে কিছু অগ্রগতি হয়, আবার সম্পর্ক খারাপ হলে পুরো সার্কের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। একটি আঞ্চলিক সংগঠনের ভবিষ্যৎ দুই দেশের দ্বন্দ্বের ওপর এত বেশি নির্ভর করা এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রকাশ করে।
১৮। অর্থনৈতিক বৈষম্য: সার্কভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ভারতের অর্থনীতি ও জনসংখ্যা অন্য অধিকাংশ সদস্যদেশের তুলনায় অনেক বড়। এই অসমতার কারণে ছোট দেশগুলো কখনো কখনো প্রভাবশালী সদস্যের আধিপত্যের আশঙ্কা করে। পারস্পরিক আস্থা কম থাকায় যৌথ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়।
১৯। সীমিত জনগণভিত্তিক সম্পর্ক: সার্ক জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ, সহজ ভ্রমণ ও শ্রম চলাচল যথেষ্ট বাড়াতে পারেনি। ভিসা জটিলতা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সাধারণ মানুষ একে অপরের দেশ ভ্রমণে বাধার মুখে পড়ে। ফলে সার্কের কার্যক্রম মূলত সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকেছে।
২০। দুর্বল প্রতিষ্ঠান: সার্ক সচিবালয় মূলত সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে; এর নিজস্ব শক্তিশালী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ক্ষমতা নেই। পর্যাপ্ত অর্থ, জনবল ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অভাবে এটি সদস্যদেশগুলোর ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিলম্ব ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
২১। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা: সার্কের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে সদস্যদেশগুলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বা বিকল্প আঞ্চলিক সংগঠনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ কিছু দেশ বিমসটেকের মতো অন্য কাঠামোতে সক্রিয় হয়েছে। এতে সার্কের প্রতি রাজনৈতিক আগ্রহ আরও কমেছে, যদিও সংগঠনটির প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়েছে।
২২। নিরাপত্তা অবিশ্বাস: সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত সমস্যা, অবৈধ অভিবাসন ও বিদ্রোহ নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ রয়েছে। এই অবিশ্বাসের কারণে নিরাপত্তা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম কার্যকরভাবে এগোয়নি। নিরাপত্তা সহযোগিতার অভাবে সার্ক আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।
উপসংহার: সার্ক পুরোপুরি ব্যর্থ নয়, আবার একে সফল আঞ্চলিক সংগঠনও বলা যায় না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার দরজা খুলেছে, কিন্তু রাজনৈতিক অবিশ্বাস সেই দরজাকে দীর্ঘদিন ধরে সংকুচিত করে রেখেছে। সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন, বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্ত এবং বাণিজ্য ও যোগাযোগ সম্প্রসারণ জরুরি।