- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি, যেখানে রাষ্ট্রের কাঠামো, জনগণের অধিকার ও সরকারের ক্ষমতা নির্ধারিত থাকে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রয়োজন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার ব্যবস্থা রাখা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানেও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে, যা সংবিধানকে যুগোপযোগী রাখতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি:
১। সংবিধান সংশোধনের ধারণা: সংবিধান সংশোধন বলতে সংবিধানের কোনো ধারা, অনুচ্ছেদ বা অংশে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন বা পুনর্বিন্যাস করাকে বোঝায়। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংবিধানকে কার্যকর রাখার জন্য সংশোধনের প্রয়োজন হয়। তবে সংবিধান সংশোধন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় এর জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
২। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ: বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের মূল বিধান সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তন, সংযোজন বা বাতিল করতে পারে। তবে সাধারণ আইনের মতো সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করা যায় না; এর জন্য বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়।
৩। সংশোধনী বিল উত্থাপন: সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রথমে জাতীয় সংসদে একটি সংশোধনী বিল উত্থাপন করতে হয়। এই বিল কোনো সংসদ সদস্য বা সরকার কর্তৃক প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করা হতে পারে। বিলের মাধ্যমে সংবিধানের কোন অংশ পরিবর্তন করা হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় এবং সংসদের নিয়ম অনুযায়ী এর ওপর আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়।
৪। বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা: বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এই বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান সংবিধানের স্থায়িত্ব রক্ষা করে এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করে।
৫। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন: জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর তা রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের বিধান অনুযায়ী এতে সম্মতি প্রদান করেন। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর সংশোধনী আইন হিসেবে কার্যকর হয় এবং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অংশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন যুক্ত হয়।
৬। গণভোটের বিষয়: বাংলাদেশের সংবিধানের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সংবিধানের পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বর্তমানে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমেই সংশোধনী কার্যকর করা হয়।
৭। সংশোধনের সীমাবদ্ধতা: সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকলেও তা সীমাহীন নয়। সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা মূল বৈশিষ্ট্য নষ্ট করা যায় না—এমন নীতি বাংলাদেশের সাংবিধানিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক আদর্শ ও রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়।
৮। বিচার বিভাগের ভূমিকা: সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হতে পারে। এর মাধ্যমে সংবিধানের সর্বোচ্চতা ও সাংবিধানিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
৯। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন: একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে হতে পারে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক পরিবর্তন ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনা করে সংবিধান সংশোধন করা হয়। তবে প্রতিটি সংশোধনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মূলনীতি, জনগণের অধিকার ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
১০। সংশোধনের গুরুত্ব: সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এটি একদিকে যেমন সংবিধানকে আধুনিক ও কার্যকর রাখে, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলো সংরক্ষণে সহায়তা করে। সঠিক নিয়ম অনুসরণ করে সংশোধন করা হলে এটি দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার: বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন একটি সুসংগঠিত ও বিশেষ প্রক্রিয়াভিত্তিক ব্যবস্থা। জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন এবং সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধানে পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকলেও এর মূল আদর্শ ও কাঠামো রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।