- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হলো POSDCORB। লুথার গুলিক এবং লিন্ডাল আরভিক ১৯৩৭ সালে তাঁদের ‘Papers on the Science of Administration’ গ্রন্থে এটি উপস্থাপন করেন। এই ধারণাটি মূলত সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালন প্রক্রিয়াকে সহজে বোঝানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি মূলত ৭টি ভিন্ন ভিন্ন কাজের সমন্বয়ে গঠিত, যা একটি দক্ষ ও কার্যকরী প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই মডেলটি আধুনিক ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল ও সহজবোধ্য করে তোলে।
১। পরিকল্পনা (Planning): প্রশাসন পরিচালনায় পরিকল্পনা হলো প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি হলো ভবিষ্যতের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা তৈরি করা। এই ধাপে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং তা অর্জনের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। একটি ভালো পরিকল্পনা কাজের প্রতিটি ধাপকে সংজ্ঞায়িত করে, সম্ভাব্য বাধাগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলোকে মোকাবিলা করার জন্য সমাধান প্রস্তুত রাখে। পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজই সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, কারণ এটি দিকনির্দেশনা দেয় এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ এড়াতে সাহায্য করে।
২। সংগঠন (Organizing): সংগঠন হলো পরিকল্পনা অনুসারে প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ও অন্যান্য সম্পদকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো। এই ধাপে কর্মীদের মধ্যে কাজের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়, বিভিন্ন বিভাগ তৈরি করা হয় এবং প্রতিটি বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। কার্যকর সংগঠন নিশ্চিত করে যে সঠিক ব্যক্তি সঠিক কাজটি করছে, যার ফলে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং কাজের গতি বাড়ে। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করে, যা লক্ষ্য অর্জনের জন্য অপরিহার্য।
৩। কর্মীসংস্থান (Staffing): কর্মীসংস্থান বলতে প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত কর্মচারী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং তাদের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রমকে বোঝায়। এটি নিশ্চিত করে যে প্রতিটি পদে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তি কাজ করছে। এই ধাপে নতুন কর্মী নিয়োগ, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মজীবনের উন্নতি নিয়ে কাজ করা হয়। একটি শক্তিশালী কর্মীসংস্থান প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কর্মীরাই একটি প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি।
৪। নির্দেশনা (Directing): নির্দেশনা হলো কর্মীদেরকে কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত করা, তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের তত্ত্বাবধান করা। এটি ব্যবস্থাপকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে একটি, কারণ নির্দেশনা ছাড়া কর্মীরা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে বিভ্রান্ত হতে পারে। এই ধাপে ব্যবস্থাপক নেতৃত্ব দেন, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করেন। কার্যকরী নির্দেশনা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ায় এবং তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৫। সমন্বয়সাধন (Coordinating): সমন্বয়সাধন হলো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ এবং কর্মীদের মধ্যে কাজের মিল রাখা। এটি নিশ্চিত করে যে প্রতিটি বিভাগ আলাদাভাবে কাজ করলেও, তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেন প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করা হয় এবং একটি সুসংহত কর্মপরিবেশ তৈরি করা হয়। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমকে মসৃণ ও নিরবচ্ছিন্ন করে তোলে।
৬। প্রতিবেদন (Reporting): প্রতিবেদন হলো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করা। এটি ব্যবস্থাপককে কাজের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত করে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এই ধাপে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, যা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরে। সঠিক প্রতিবেদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
৭। বাজেট (Budgeting): বাজেট হলো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিকল্পনা এবং কার্যক্রমের একটি বিস্তারিত রূপরেখা। এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রতিষ্ঠানের আয় এবং ব্যয়ের একটি অনুমান তৈরি করে। বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সম্পদগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা কোনো প্রকল্পের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য।
উপসংহার: POSDCORB মডেলটি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি সার্বজনীন কাঠামো। এটি প্রতিটি ব্যবস্থাপককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয় এবং তাদের কাজকে সুসংগঠিত করতে সাহায্য করে। এই ৭টি ধাপ একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষ পরিচালন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এই মডেলটি প্রশাসনিক কার্যক্রমকে বিজ্ঞানসম্মত এবং পদ্ধতিগত করে তোলে, যার ফলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তার লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হয়। যদিও এটি কিছু সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক ধারণা হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
- পরিকল্পনা
- সংগঠন
- কর্মীসংস্থান
- নির্দেশনা
- সমন্বয়সাধন
- প্রতিবেদন
- বাজেট
১৯৩৭ সালে লুথার গুলিক (Luther Gulick) এবং লিন্ডাল আরভিক (Lyndall Urwick) তাদের ‘Papers on the Science of Administration’ গ্রন্থে এই ধারণাটি উপস্থাপন করেন। তাদের এই গবেষণাটি হেনরি ফেয়লের (Henri Fayol) ১৪টি প্রশাসনিক নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। যদিও ফেয়ল নিজেই ‘POSDCORB‘-এর মতো কোনো নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেননি, তার নীতিগুলোই এই মডেলের ভিত্তি। এই ধারণাটি ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

