- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। তবে আমাদের দেশের বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের মানুষের মতামত কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই বাস্তবতার আলোকেই নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১। অংশগ্রহণের অভাব: বাংলাদেশে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামতের চেয়ে উপর মহলের সিদ্ধান্তকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। গ্রামীণ বা শহর অঞ্চলের সাধারণ মানুষ জানতেও পারে না তাদের এলাকায় কী প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। ফলে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশীদারিত্ব কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা এই ধারণাকে একটি মোহে পরিণত করেছে।
২। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য প্রবলভাবে বজায় থাকে। সরকারি কর্মকর্তারা অনেক সময় স্থানীয় জনগণের চাহিদা বা বাস্তবসম্মত পরামর্শকে গুরুত্ব দিতে চান না। এই প্রশাসনিক জটিলতা ও অনমনীয়তার কারণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং উন্নয়ন একটি চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
৩। রাজনৈতিক প্রভাব: স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মূলত রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়। দলীয় স্বার্থ ও ভোটব্যাংক বিবেচনা করে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এতে বিরোধী মতাদর্শ বা সাধারণ জনগণের প্রকৃত চাহিদার কোনো প্রতিফলন ঘটে না, যা অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের মূল চেতনাকে ধ্বংস করে।
৪। তৃণমূলের অবহেলা: বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদেরা অধিকাংশ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যেখানে তৃণমূলের মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত থাকে। কৃষক, শ্রমিক বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সমস্যাগুলো নীতি নির্ধারণীতে স্থান পায় না। এই কাঠামোগত দূরত্বের কারণে প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ একটি সুন্দর স্লোগান ছাড়া আর কিছুই হতে পারে নাই।
৫। তথ্যের অপর্যাপ্ততা: যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগণকে সেই বিষয়ে সঠিক ও বিস্তারিত তথ্য প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে প্রকল্পের বাজেট, উদ্দেশ্য বা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রাখা হয়। তথ্যের এই ঘাটতির কারণে জনগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না এবং প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে ব্যর্থ হয়।
৬। অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণ: স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও তা মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী ও ধনীক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা এই প্রক্রিয়া থেকে সব সময় দূরেই থেকে যায়। ফলে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন বলতে যা বোঝায়, তা কেবল সমাজের একটি নির্দিষ্ট উচ্চবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
৭। স্বচ্ছতার ঘাটতি: বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব একটি অন্যতম প্রধান বড় সমস্যা হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে চিহ্নিত হয়ে আসছে। প্রকল্পসমূহের ব্যয় ও কাজের মান নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন তোলার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ রাখা হয় না। এই গোপনীয়তার সংস্কৃতির কারণে জনগণের মনে এক ধরণের উদাসীনতা তৈরি হয়, যা অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
৮। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা পরিষদ আইনত শক্তিশালী হলেও বাস্তবে তাদের স্বায়ত্তশাসন অত্যন্ত সীমিত। কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান ও নির্দেশনার ওপর তাদের সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে স্বাধীনভাবে কোনো কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন না।
৯। নারীর প্রান্তিককরণ: জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অত্যন্ত নগণ্য। বিভিন্ন কমিটিতে নারীর নাম থাকলেও বাস্তবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারী সমাজের এই নামমাত্র অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে সামগ্রিক অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন এখনো একটি দূরবর্তী স্বপ্ন।
১০। দাতাগোষ্ঠীর শর্ত: বাংলাদেশের অনেক বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বৈদেশিক ঋণ বা দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় পরিচালিত হয়ে থাকে। এই সংস্থাগুলো নিজস্ব নীতি ও শর্তানুযায়ী প্রকল্প তৈরি করে, যা অনেক সময় স্থানীয় বাস্তবতার সাথে মেলে না। দাতাগোষ্ঠীর এই চাপিয়ে দেওয়া এজেন্ডা বাস্তবায়নের তাড়াহুড়োয় স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়ার সুযোগ বা প্রয়োজন কোনোটিই থাকে না।
১১। সচেতনতার অভাব: এদেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো তাদের নাগরিক অধিকার এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা মনে করে উন্নয়ন হলো সরকারের দয়া বা উপরি পাওনা, যেখানে তাদের কিছু বলার নেই। জনগণের এই অসচেতনতা ও অধিকারবোধের অভাবকে কাজে লাগিয়ে নীতিনির্ধারকেরা অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের বিষয়টিকে অনায়াসে এড়িয়ে যান।
১২। এনজিওর ভূমিকা: উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলো অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির কথা বললেও অনেক সময় তাদের কর্মকাণ্ড দাতা নির্ভর হয়। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপে তারা জনগণের টেকসই অংশগ্রহণের চেয়ে কাগুজে হিসাব মেলাতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতির বিকাশ অলীক রূপেই থেকে যায়।
১৩। দুর্নীতির বিস্তার: উন্নয়ন প্রকল্প এলেই এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের মধ্যে অর্থ আত্মসাতের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এই দুর্নীতি লুকাতে তারা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বা নজরদারিকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। দুর্নীতিগ্রস্ত এই ব্যবস্থার কারণে সৎ ও সাধারণ নাগরিকেরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে ভয় পান বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
১৪। দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ: রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য অনেক সময় মেয়াদের শেষ দিকে এসে তড়িঘড়ি করে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এই দ্রুত কাজ শেষ করার মানসিকতার কারণে জনমত যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি বাদ পড়ে যায়। তড়িঘড়ি করে নেওয়া এসব সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের কোনো সুযোগ থাকে না, যা জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
১৫। শহরাঞ্চল কেন্দ্রিকতা: বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় বড় নীতি ও উন্নয়ন বাজেট রাজধানী বা বড় শহরগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের উন্নয়নে তাদের নিজস্ব কোনো মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে না। এই আঞ্চলিক বৈষম্য ও শহরকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে গ্রামীণ জনপদের বড় অংশ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বাইরেই থেকে যায়।
১৬। সামাজিক বিভাজন: গ্রামীণ ও নগর সমাজে বিদ্যমান তীব্র শ্রেণিভেদ, জাত-পাত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সুষম অংশগ্রহণের বড় অন্তরায়। সমাজের প্রভাবশালী গোষ্ঠী কখনোই চায় না যে দরিদ্র মানুষ তাদের পাশে বসে সমান অধিকারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক। এই সামাজিক বিভাজন ও আধিপত্য বিস্তারের সংস্কৃতির কারণে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর সবসময়ই চেপে রাখা হয়।
১৭। টেকসইতার অভাব: যেহেতু অধিকাংশ প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের কোনো মালিকনাবোধ বা সম্পৃক্ততা থাকে না, তাই প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তা অকেজো হয়ে পড়ে। জনগণ মনে করে এটি সরকারের সম্পদ, তাই রক্ষণাবেক্ষণে কেউ এগিয়ে আসে না। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এই ধরণের সাময়িক উন্নয়ন সামাজিকভাবে স্থায়ী বা টেকসই কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না।
১৮। আইনি সীমাবদ্ধতা: কাগজে-কলমে জনগণের অংশগ্রহণের কথা বলা হলেও বাস্তবে আইনগতভাবে সাধারণ মানুষকে শক্তিশালী করার কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো নেই। যদি কোনো প্রকল্পে জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়, তবে তা আইনিভাবে প্রতিহত করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এই আইনি সুরক্ষার অভাব সাধারণ মানুষকে উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে দূরে ঠেলে দেয় এবং এটিকে একটি মোহে রূপ দেয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন ধারণাটি এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এবং এটি অনেকাংশেই একটি মোহ বা তাত্ত্বিক বিলাসিতা হিসেবে রয়ে গেছে। তবে একে সফল করতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং তৃণমূল মানুষের কণ্ঠস্বরকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। একমাত্র প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সক্রিয় সচেতনতাই পারে এই মোহকে বাস্তবে রূপান্তর করতে।