- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: অধ্যাপক এ.ভি. ডাইসি তার বিখ্যাত গ্রন্থ “Introduction to the Study of the Law of the Constitution” (১৮৮৫) এ আইনের অনুশাসন (Rule of Law) ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন। এটি ব্রিটিশ সংবিধানের অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। ডাইসি আইনের অনুশাসনকে তিনটি প্রধান নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছেন।
১. আইনের চূড়ান্ত প্রাধান্য (Supremacy of Law): ডাইসির মতে, রাষ্ট্রের কোনো ব্যক্তির বা কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা থাকতে পারে না। সকল নাগরিকই আইনের অধীন। কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, যদি না তিনি সাধারণ আদালতে সাধারণ আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। এর অর্থ হল, সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের খেয়াল-খুশি মতো কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে না; তাদের সকল কাজ আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও সীমাবদ্ধ থাকবে।
২. আইনের দৃষ্টিতে সমতা (Equality before Law): এই নীতি অনুসারে, দেশের সকল নাগরিক, তাদের পদমর্যাদা, সামাজিক অবস্থান বা সরকারি পদ যাই হোক না কেন, সাধারণ আইনের কাছে সমান। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে একজন সাধারণ পুলিশ অফিসার পর্যন্ত সবাই একই ধরনের অপরাধের জন্য একই আদালতে বিচার লাভ করবে। ডাইসি এই ধারণাকে ফরাসি প্রশাসনিক আইন (droit administratif) থেকে ভিন্ন বলে মনে করেন, যেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সাধারণ নাগরিকদের থেকে আলাদা বিচারিক ব্যবস্থা ছিল।
৩. বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তই নাগরিক অধিকারের উৎস (Predominance of Legal Spirit): ডাইসি বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটেনে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং অধিকার কোনো লিখিত সংবিধানের মাধ্যমে সুরক্ষিত নয়, বরং বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা গড়ে উঠেছে। তিনি মনে করতেন, বিচারকরা যখন কোনো নাগরিকের অধিকার বা স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করেন, তখন তাদের রায়ই আইনের অনুশাসনের নীতিগুলোকে প্রতিষ্ঠা করে। এই নীতি অনুযায়ী, অধিকারগুলো আইনের ফলস্বরূপ নয়, বরং বিচারিক রায় থেকেই অধিকারের জন্ম হয়।
১. ক্ষমতার স্বেচ্ছাচার রোধ: ডাইসির আইনের অনুশাসনের প্রথম এবং প্রধান গুরুত্ব হলো এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে লাগামহীন স্বেচ্ছাচার থেকে রক্ষা করে। এটি নিশ্চিত করে যে কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি অনুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে না, বরং সকলকেই আইন মেনে চলতে হবে। এটি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে।
২. আইনের চোখে সমতা প্রতিষ্ঠা: এই ধারণাটি সমাজের সকল মানুষের জন্য আইনের চোখে সমতা নিশ্চিত করে। এটি বলে যে সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি থেকে শুরু করে একজন সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সবাই একই আইনের অধীন এবং একই আদালতে বিচার লাভ করবে। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
৩. ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা: ডাইসির মতে, আইনের অনুশাসন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত করে। যেহেতু কোনো ব্যক্তিকে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তি দেওয়া বা তার সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া যায় না, তাই এটি নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
৪. বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা: ডাইসির ধারণা বিচার বিভাগের গুরুত্বকে তুলে ধরে। তার মতে, বিচারকরাই জনগণের অধিকার রক্ষা করেন এবং আইনের অনুশাসনকে বাস্তবায়ন করেন। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে অপরিহার্য করে তোলে, যা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. সরকার এবং জনগণের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন: যখন জনগণ দেখে যে সরকার নিজেই আইন মেনে চলছে এবং তাদের কোনো পদক্ষেপ স্বেচ্ছাচারী নয়, তখন সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে ওঠে। এটি সুশাসনের জন্য অপরিহার্য।
৬. লিখিত সংবিধানের বিকল্প: ডাইসি মনে করতেন যে ব্রিটিশ সংবিধান অলিখিত হলেও আইনের অনুশাসনই সেখানে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করে। এটি একটি অলিখিত সংবিধানের অধীনেও অধিকার ও স্বাধীনতার সুরক্ষা প্রদানে সহায়তা করে।
ডাইসির এই ধারণাটি ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছে। প্রধান সমালোচকদের মধ্যে আছেন স্যার আইভর জেনিংস, অধ্যাপক এইচ. জে. ল্যাস্কি এবং ডব্লিউ. এ. রবসন। তাদের সমালোচনার মূল দিকগুলো হলো:
১। প্রশাসনিক আইনের অস্তিত্ব উপেক্ষা: ডাইসি ফরাসি প্রশাসনিক আইনকে প্রত্যাখ্যান করলেও, ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় এর অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারেননি। সরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে বিশেষ ক্ষমতা ও বিচার-বহির্ভূত ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে, যা সাধারণ আদালত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। বিশেষ করে, আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ব্যাপক বিবেচনামূলক ক্ষমতা থাকে, যা ডাইসির “আইনের চূড়ান্ত প্রাধান্য” নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
২। অর্থনৈতিক বৈষম্যের উপেক্ষা: ডাইসি কেবল আইনি সমতার কথা বলেছেন, কিন্তু বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকটি উপেক্ষা করেছেন। অধ্যাপক ল্যাস্কি যুক্তি দেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত “আইনের দৃষ্টিতে সমতা” একটি অর্থহীন স্লোগান। সমাজের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইন এবং বিচার ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, যা গরিব ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য আইনকে অকার্যকর করে তোলে।
৩। সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক অধিকারের অভাব: ডাইসি মনে করতেন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। এর ফলস্বরূপ, পার্লামেন্ট যেকোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে, এমনকি যদি তা ব্যক্তির অধিকারের পরিপন্থীও হয়। যেহেতু ব্রিটেনে লিখিত মৌলিক অধিকারের কোনো সাংবিধানিক সুরক্ষা নেই, তাই পার্লামেন্ট যেকোনো সময় সাধারণ আইন পরিবর্তন করে ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। এটি আইনের অনুশাসনের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষা, এর পরিপন্থী।
৪। বিচারিক রায়ই অধিকারের একমাত্র উৎস নয়: ডাইসির তৃতীয় নীতিটি বিতর্কিত। কারণ, আধুনিক রাষ্ট্রে অনেক নাগরিক অধিকার আইনসভা কর্তৃক প্রণীত আইনের মাধ্যমেই স্বীকৃত ও সুরক্ষিত হয়। বিচার বিভাগ কেবল সেই আইনগুলোকে প্রয়োগ করে। ডাইসির সময়ের পর থেকে পার্লামেন্ট বিভিন্ন আইন যেমন- মানবাধিকার আইন (Human Rights Act) পাস করেছে, যা নাগরিকদের অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে সুরক্ষিত করেছে। তাই, শুধুমাত্র বিচারিক সিদ্ধান্তকে অধিকারের উৎস হিসেবে দেখা ভুল।
৫। সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ও আইনের অনুশাসন পরস্পর বিরোধী: ডাইসি একই সাথে সংসদীয় সার্বভৌমত্ব (Parliamentary Sovereignty) এবং আইনের অনুশাসন উভয় নীতিতেই বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু এই দুটি ধারণার মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। সংসদীয় সার্বভৌমত্ব মানে হলো পার্লামেন্ট দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং যেকোনো আইন প্রণয়ন, সংশোধন বা বাতিল করতে পারে, এমনকি যদি তা সাধারণ আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থীও হয়। এর ফলে, তত্ত্বগতভাবে, পার্লামেন্ট এমন আইন পাস করতে পারে যা কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সীমিত করে বা বৈষম্য সৃষ্টি করে। এই ক্ষমতা আইনের অনুশাসনের মূল ভিত্তি, অর্থাৎ রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচার থেকে জনগণের অধিকার রক্ষা, এর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। অনেক সমালোচকের মতে, ব্রিটিশ ব্যবস্থায় সংসদীয় সার্বভৌমত্ব এতটাই শক্তিশালী যে তা আইনের অনুশাসনের ধারণাটিকে দুর্বল করে তোলে।
৬। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সীমাবদ্ধতা: ডাইসির ধারণাটি মূলত ১৯শ শতাব্দীর ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। সেই সময়কার উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল সীমিত, যা ‘লেসে-ফেয়ার’ (laissez-faire) নামে পরিচিত। কিন্তু ২০শ শতাব্দীর কল্যাণ রাষ্ট্রে (Welfare State) সরকারের ভূমিকা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের কারণে আমলাতন্ত্রের হাতে প্রচুর ক্ষমতা আসে। এই নতুন প্রেক্ষাপটে ডাইসির ধারণাগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
৭। জরুরি অবস্থার বিধান উপেক্ষা: ডাইসি তার তত্ত্বে জরুরি অবস্থার সময় সরকারের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন যুদ্ধ বা মহামারী, সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার সীমিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জনগণের চলাচল, সমাবেশ বা সম্পত্তির অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত করা যায়। এই ধরনের বিশেষ ক্ষমতা ডাইসির “আইনের চূড়ান্ত প্রাধান্য” এবং “আইনের দৃষ্টিতে সমতা” নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
৮। সাধারণ আইন ও প্রশাসনিক আইনের পার্থক্য: ডাইসি সাধারণ আইনকে (Common Law) অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক আইনের (Administrative Law) ভূমিকা ব্যাপক। প্রশাসনিক আইন হলো সেই নিয়মাবলী যা সরকারি সংস্থা ও কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ডাইসি ফরাসি প্রশাসনিক আইনকে ব্রিটিশ ব্যবস্থার বিরোধী হিসেবে দেখিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও প্রশাসনিক আইন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা সাধারণ আদালতের এখতিয়ারের বাইরে।
৯। আধুনিক আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার অবহেলা: ডাইসি বিচারকদের রায়কে অধিকারের প্রধান উৎস হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনসভার (পার্লামেন্ট) মাধ্যমে জনগণের অধিকার ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত ও বিস্তৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটেনের মানবাধিকার আইন (Human Rights Act, ১৯৯৮) বা সমতা আইন (Equality Act, ২০১০) নাগরিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে, যা শুধুমাত্র বিচারকের রায় দিয়ে সম্ভব হতো না।
১০। অধিকারের সাংবিধানিক সুরক্ষার অভাব: ডাইসির ধারণা অনুযায়ী, ব্রিটিশ ব্যবস্থায় কোনো লিখিত মৌলিক অধিকারের দলিল নেই। এর ফলে পার্লামেন্ট যেকোনো সময় সাধারণ আইন পরিবর্তন করে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে। যদিও ডাইসি মনে করতেন সংসদ তা করবে না, তবুও এই ধরনের ক্ষমতা আইনের অনুশাসনের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য একটি বড় হুমকি। তাই, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ লিখিত সাংবিধানিক সুরক্ষাকে আইনের অনুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।
উপসংহার: ডাইসির ধারণাটি আইনের অনুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রারম্ভিক ব্যাখ্যা দিলেও, আধুনিক রাষ্ট্রের জটিলতা ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি অনেকাংশে অসম্পূর্ণ এবং কাল্পনিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, আইনের অনুশাসন সম্পর্কিত আলোচনায় ডাইসির তিনটি নীতি আজও একটি মৌলিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত।

