- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: রাজনৈতিক অংশগ্রহণ একটি দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশ ও রাজনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জনগণ যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নির্বাচন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ করে, তখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা অধিক কার্যকর হয়। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার কারণে জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়।
উন্নয়নশীল দেশসমূহে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাসমূহ:
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান বাধা। ঘন ঘন রাজনৈতিক সংঘাত, সরকার পরিবর্তনের সংকট, সহিংস আন্দোলন ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবেশ সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখে। এর ফলে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক অনাগ্রহ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়।
২। দারিদ্র্য সমস্যা: দারিদ্র্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রধান মনোযোগ থাকে জীবিকা নির্বাহের দিকে, ফলে তারা রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সময়, অর্থ ও সুযোগ পায় না। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়।
৩। শিক্ষার অভাব: উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত রাজনৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার অভাবে জনগণ তাদের রাজনৈতিক অধিকার, ভোটের গুরুত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে না। ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে।
৪। রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব: রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব জনগণের অংশগ্রহণকে দুর্বল করে। অনেক মানুষ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি নীতি ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ হারায়। সচেতনতার ঘাটতি জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখে এবং গণতান্ত্রিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
৫। দুর্বল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক সময় রাজনৈতিক দল, নির্বাচন ব্যবস্থা ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট শক্তিশালী হয় না। প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে। শক্তিশালী ও কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন।
৬। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার: দুর্নীতি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা সৃষ্টি করে। যখন জনগণ মনে করে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে, তখন তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ক্ষমতার অপব্যবহার জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল করে।
৭। সামাজিক বৈষম্য: সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগকে অসম করে তোলে। ধনী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ পেলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনেক সময় পিছিয়ে থাকে। এর ফলে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না।
৮। রাজনৈতিক সহিংসতা: রাজনৈতিক সহিংসতা জনগণের স্বাভাবিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। সংঘর্ষ, ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ না থাকলে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়।
৯। গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা: স্বাধীন ও কার্যকর গণমাধ্যম রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর ফলে জনগণ প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং অংশগ্রহণের সুযোগ কমে যায়।
১০। নারীর সীমিত অংশগ্রহণ: অনেক উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। শিক্ষা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক বাধা ও নেতৃত্বের সুযোগের অভাব নারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
উপসংহার: উন্নয়নশীল দেশসমূহে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন বাধা রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে শিক্ষা বিস্তার, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন ও নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই একটি উন্নত ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠনের মূল ভিত্তি।