- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত মালিক হলো জনগণ। আর এই জনগণের যে অংশ ভোটদানের মাধ্যমে সরকার গঠনে অংশ নেয়, তাদেরই নির্বাচকমণ্ডলী বলা হয়। নির্বাচকমণ্ডলীকে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি এবং চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে নির্বাচকমণ্ডলীর ভূমিকা ও কার্যাবলি অপরিসীম।
নির্বাচকমণ্ডলীর গুরুত্ব ও কার্যাবলি
১। সরকার গঠন: আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচকমণ্ডলীর প্রধান কাজ হলো নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করা। নাগরিকেরা তাদের মূল্যবান ভোট প্রয়োগ করে পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করার সুযোগ লাভ করেন। ফলে নির্বাচকমণ্ডলী ছাড়া কোনো বৈধ সরকার গঠন করা একেবারেই অসম্ভব।
২। জনপ্রতিনিধি নির্বাচন: রাষ্ট্রের আইনসভা ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য উপযুক্ত প্রতিনিধি বাছাই করার দায়িত্ব নির্বাচকমণ্ডলীর। ভোটাররা প্রার্থীদের যোগ্যতা, সততা ও অতীত কাজের মূল্যায়ন করে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এই প্রতিনিধি নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩। সার্বভৌমত্ব প্রকাশ: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচকমণ্ডলী হলো জনগণের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। ভোটের দিন নাগরিকেরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পান। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস আসলে সাধারণ জনগণ। নির্বাচকমণ্ডলীর রায়ই রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।
৪। জনমতের প্রতিফলন: নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক জনমতের সঠিক এবং বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। নির্বাচকমণ্ডলী ভোটদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি ও আদর্শের প্রতি তাদের সমর্থন বা অসমর্থন প্রকাশ করে। এটি সরকারের কাছে জনগণের মনের ভাষা বোঝার একটি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। জনমতের এই প্রতিফলন রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।
৫। সরকার নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচকমণ্ডলী তাদের ভোট অধিকারের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারকে সবসময় সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখে। কোনো সরকার যদি জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজ করে, তবে পরবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এই ভয়ের কারণে ক্ষমতাসীন দল সবসময় জনকল্যাণমূলক কাজ করতে বাধ্য থাকে। ফলে সরকার কখনো স্বৈরাচারী বা একনায়কতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে না।
৬। রাজনৈতিক সচেতনতা: নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং ভোটদানের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচার-প্রচারণা দেখে ভোটাররা দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারেন। এর ফলে নাগরিকেরা নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন হয়ে ওঠেন। এই সচেতনতা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
৭। শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন: ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন নিশ্চিত করে নির্বাচকমণ্ডলী। কোনো রক্তপাত বা সহিংসতা ছাড়াই কেবল ভোটের মাধ্যমে একটি সরকারের পতন এবং নতুন সরকারের আগমন ঘটে। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সবচেয়ে চমৎকার ও গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। নির্বাচকমণ্ডলী এই ব্যবস্থার মূল পাহারাদার হিসেবে কাজ করে।
৮। জনকল্যাণ নিশ্চিত: রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে নির্বাচকমণ্ডলীর সমর্থন পাওয়ার জন্য নানা ধরনের জনকল্যাণমূলক ইশতেহার ঘোষণা করে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে তারা বাধ্য থাকে। কারণ তারা জানে যে জনগণকে অবহেলা করলে পরবর্তীতে আর ক্ষমতায় থাকা যাবে না। এভাবে নির্বাচকমণ্ডলীর পরোক্ষ প্রভাবে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
৯। অধিকার রক্ষা: নাগরিক অধিকার রক্ষা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে নির্বাচকমণ্ডলী একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। শাসন বিভাগ বা আইনসভা যাতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করতে না পারে, ভোটাররা সেদিকে খেয়াল রাখেন। অধিকার হরণকারী যেকোনো শক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচকমণ্ডলী ব্যালটের মাধ্যমে তাদের তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে সমাজে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অনেক সহজ হয়।
১০। আইনসভার বৈধতা: রাষ্ট্রের আইন তৈরি করার সর্বোচ্চ স্থান হলো জাতীয় আইনসভা বা সংসদ। এই আইনসভার সদস্যদের নির্বাচিত করে নির্বাচকমণ্ডলী তার আইনগত ও নৈতিক বৈধতা প্রদান করে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত না হলে আইনসভার কোনো আইনের প্রতি জনগণের আস্থা থাকে না। তাই আইনসভাকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচকমণ্ডলীর ভূমিকা অপরিহার্য।
১১। নীতির মূল্যায়ন: রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও পরিকল্পনার ভালো-মন্দ বিচার করার সুযোগ পায় নির্বাচকমণ্ডলী। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে। ভোটাররা সেই নীতিগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে উপযোগী দলটিকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেন। এর ফলে রাষ্ট্রের সঠিক নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়।
১২। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা: একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখে দেশের জাগ্রত নির্বাচকমণ্ডলী। নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচনের আয়োজন করে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সচল ও প্রাণবন্ত রাখে। যদি নির্বাচকমণ্ডলী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক।
১৩। যোগসূত্র স্থাপন: নির্বাচকমণ্ডলী মূলত সাধারণ জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মধ্যে একটি মজবুত রাজনৈতিক যোগসূত্র স্থাপন করে। জনগণের চাওয়া-পাওয়াগুলো প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। আবার সরকারের সিদ্ধান্তগুলো জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য, তাও নির্বাচকমণ্ডলীর আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই দ্বিমুখী যোগাযোগ রাষ্ট্রকে স্থায়িত্ব প্রদান করে।
১৪। বিপ্লব প্রতিরোধ: সমাজে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা বা সশস্ত্র বিপ্লব প্রতিরোধে নির্বাচকমণ্ডলীর ভূমিকা অনন্য। যখন নাগরিকেরা ভোটের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ বা অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ পান, তখন তারা আর ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেন না। ব্যালট পেপারই তখন বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী ও শান্তিপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এটি রাষ্ট্রকে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে।
১৫। জবাবদিহিতা তৈরি: নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার মূল চাবিকাঠি হলো নির্বাচকমণ্ডলী। প্রতিনিধিরা ভালো করেই জানেন যে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে তাদের আবার ভোটারদের মুখোমুখি হতে হবে। এই জবাবদিহিতার সংস্কৃতির কারণে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার অনেক অংশে কমে যায়। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়।
১৬। জাতীয় ঐক্য: নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুরো দেশের মানুষের মধ্যে একটি জাতীয় ঐক্য এবং উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দল-মত নির্বিশেষে সকল নাগরিক একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নেন। এটি নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করে। নির্বাচকমণ্ডলীর এই সম্মিলিত অংশগ্রহণ রাষ্ট্রীয় সংহতিকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে।
১৭। আন্তর্জাতিক মর্যাদা: যে দেশে নির্বাচকমণ্ডলী যত বেশি স্বাধীন ও সক্রিয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বে সেই দেশের গণতান্ত্রিক মর্যাদা তত বেশি বৃদ্ধি পায়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে বিশ্ব সম্প্রদায় সহজে স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শন করে। এর ফলে বহির্বিশ্বের সাথে দেশের বাণিজ্য, কূটনীতি এবং বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার পথ অনেক সুগম হয়। তাই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে নির্বাচকমণ্ডলীর ভূমিকা অনেক।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো সচেতন ও সক্রিয় নির্বাচকমণ্ডলী। তারা কেবল ভোটদাতাই নন, বরং রাষ্ট্রের প্রকৃত অভিভাবক ও সুশাসনের অতন্দ্র প্রহরী। একটি আদর্শ ও সফল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে নির্বাচকমণ্ডলীর সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নির্বাচকমণ্ডলীকে সবসময় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন রাখা অত্যন্ত জরুরি।