- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বর্তমান বিশ্বে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা শুধু সামরিক শক্তি ও সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের জীবন, অর্থনীতি, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবেশের অবনতি এসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। তাই পরিবেশগত নিরাপত্তাহীনতা একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিবেশগত নিরাপত্তা (Environmental Security)-এর সংজ্ঞা: পরিবেশগত নিরাপত্তা হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিবেশের ক্ষতিকর পরিবর্তন (যেমন—জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি) থেকে রক্ষা করার বিষয়টি বোঝানো হয়। অর্থাৎ, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখাই হলো পরিবেশগত নিরাপত্তা।
১. Richard H. Ullman (1983): “জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে শুধু সামরিক হুমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এমন সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা মানুষের জীবনযাত্রার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
ব্যাখ্যা: Ullman-এর মতে, পরিবেশগত সমস্যা যেমন পানি সংকট, দূষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগও নিরাপত্তার বড় হুমকি হতে পারে।
২. Norman Myers (1989): “Environmental security refers to the protection of the natural environment and the sustainable management of resources to ensure human survival and well-being.” Myers মনে করেন, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা মানুষের অস্তিত্ব ও কল্যাণের জন্য অপরিহার্য।
৩. Jessica Tuchman Mathews (1989): “Environmental security expands the concept of security to include environmental degradation as a source of political and social instability.” Mathews-এর মতে, পরিবেশের অবনতি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে, তাই এটি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অতেএব, “পরিবেশগত নিরাপত্তা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার মাধ্যমে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হয়।”
পরিবেশগত নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার সম্পর্ক:
পরিবেশগত নিরাপত্তা বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং মানুষ ও রাষ্ট্র পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকে। পরিবেশের ক্ষতি হলে তা মানুষের মৌলিক চাহিদা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। ফলে পরিবেশগত সমস্যা জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
১. খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি: জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য সংকট মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
২. পানি সংকট: নদী, ভূগর্ভস্থ পানি ও অন্যান্য পানির উৎস দূষিত বা সংকুচিত হলে নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হয়। পানির অভাব কৃষি, শিল্প ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আঞ্চলিক বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ।
৩. জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি: বায়ু ও পানিদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন রোগের বিস্তার বাড়ে। ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি মানুষের কর্মক্ষমতা কমায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে দেশের মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হয়।
৪. প্রাকৃতিক দুর্যোগের বৃদ্ধি: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ মানুষের জীবন, সম্পদ ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
৫. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী খরার মতো সমস্যা বাড়ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি ও কৃষিজমি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এসব পরিবর্তন অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করতে পারে।
৬. কৃষি ও জীবিকার ক্ষতি: পরিবেশের পরিবর্তন কৃষি, মৎস্য ও বনজ সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মাটির উর্বরতা হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়ের কারণে মানুষের আয় কমে যেতে পারে। এতে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
৭. অর্থনৈতিক ক্ষতি: পরিবেশগত বিপর্যয় কৃষি, শিল্প, মৎস্য, পর্যটন ও অবকাঠামো খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্বাসনে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
৮. বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন: নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মানুষ বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ শহর ও নিরাপদ অঞ্চলে আবাসন, কর্মসংস্থান ও সেবা সংকট সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
৯. প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বিরোধ: পানি, বন, ভূমি ও জ্বালানি সম্পদের সংকট দেখা দিলে বিভিন্ন অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। সীমিত সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সামাজিক সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে।
১০. জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি: প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করে। জ্বালানি সংকট হলে শিল্প, পরিবহন ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।
১১. জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি: বন উজাড়, জলাভূমি ধ্বংস ও দূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং কৃষি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১২. নগর পরিবেশগত সংকট: অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা শহরের পরিবেশগত নিরাপত্তাকে দুর্বল করে। এতে পানি, স্বাস্থ্য, আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।
১৩. সামাজিক অস্থিরতা: পরিবেশগত সংকটের কারণে খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সমস্যা দেখা দিলে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। সম্পদের ঘাটতি ও বৈষম্য সামাজিক সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
১৪. প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক চাপ: বড় ধরনের পরিবেশগত দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাকে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে যুক্ত হতে হয়। ঘন ঘন দুর্যোগ হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
উপসংহার: পরিবেশগত নিরাপত্তা বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরিবেশের অবক্ষয় খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।