- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি ছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রাক্কালে অবিভক্ত বাংলাকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাখার এক সাহসী কিন্তু ব্যর্থ প্রয়াস। বাংলার দুই শীর্ষ নেতা, শরৎচন্দ্র বসু এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এই চুক্তির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিভাজন এড়িয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলা রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এটি ছিল এমন এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ যা সফল হলে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এবং বহু মানুষের ভাগ্য ভিন্ন হতে পারত। এই চুক্তি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অধ্যায়।
বসু-সোহরাওয়ার্দির চুক্তির বিবরণ: –
১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর সংকট দেখা দেয়। বাংলা প্রদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ—এই দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার উপক্রম হয়। এই বিভাজন রুখতে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বাংলার দুই প্রভাবশালী নেতা, কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু এবং মুসলিম লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, একটি গোপন চুক্তি করেন, যা বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি নামে পরিচিত।
- অবিভক্ত বাংলার সার্বভৌমত্ব: চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাকে বিভক্ত না করে এটিকে ভারত বা পাকিস্তানের অংশ না করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এটি ছিল বিভাজনের বিরুদ্ধে এক জোরালো অবস্থান।
- যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন: স্বাধীন বাংলায় একটি জোট সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেখানে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের (বা হিন্দু প্রতিনিধি) সদস্যরা সমান সংখ্যক আসনে থাকবেন। মুখ্যমন্ত্রী মুসলিম এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিন্দু হবেন—এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতার কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছিল।
- পৃথক সংবিধান সভা: নতুন স্বাধীন বাংলার জন্য একটি পৃথক সংবিধান সভা গঠনের কথা বলা হয়েছিল, যা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মকানুন তৈরি করবে। এই সভা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো নিশ্চিত করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
- ব্রিটিশ প্রত্যাহারের পর ক্ষমতা হস্তান্তর: ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগের পর সরাসরি এই স্বাধীন বাংলা সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, যা ভারত ও পাকিস্তানের কাছে ক্ষমতার হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে। এটি বাংলাকে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়।
- ধর্মীয় ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা: স্বাধীন বাংলায় হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে। চুক্তিতে সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
এই চুক্তি অবশ্য সফল হয়নি। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ—কেউই এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেননি। কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা মনে করেছিল যে, এই চুক্তি পাকিস্তানের জন্য একটি ফাঁদ হতে পারে, যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা হিন্দুদের জন্য বিপজ্জনক হবে। অন্যদিকে, মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করেছিল যে, স্বাধীন বাংলা তাদের বৃহত্তর পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্নকে ব্যাহত করবে। ফলে, এই মহৎ উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় – পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়।
শেষকথা: বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা বাংলার বিভাজন রোধ করে একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। যদিও এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি, তবে এটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। এই চুক্তি আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, চরম বিভাজনের মধ্যেও ঐক্যের জন্য প্রচেষ্টা সম্ভব। এর ব্যর্থতা উপমহাদেশের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতা বিন্যাসের এক করুণ পরিণতি।
অবিভক্ত বাংলার স্বাধীনতা চুক্তি।
বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৯৪৭ সালের মে মাসে। শরৎচন্দ্র বসুর জীবনীকার লিয়াকত আলী খান ১৯৫০-এর দশকে এই চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন। ১৯৪৭ সালের জুন মাসে মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা ঘোষণার পর এই চুক্তির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একটি জরিপ অনুযায়ী, বাংলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪% মুসলিম এবং ৪৪% হিন্দু ছিল। এই চুক্তির ব্যর্থতা কেবল বাংলার বিভাজনই ঘটায়নি, বরং বহু মানুষের স্থানচ্যুতি ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণ হয়েছিল, বিশেষত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়।

