- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বহুদলীয় ব্যবস্থায় দুইয়ের অধিক রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। এই ব্যবস্থা জনগণকে অধিক রাজনৈতিক বিকল্প, বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব ও মতপ্রকাশের সুযোগ দিলেও জোটের অস্থিরতা, দলীয় বিভাজন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতার মতো কিছু সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে।
বহুদলীয় ব্যবস্থার দোষ-গুণ সমূহ আলোচনা:
১। বিকল্পের সুযোগ: বহুদলীয় ব্যবস্থায় ভোটারদের সামনে একাধিক রাজনৈতিক দল ও কর্মসূচি থাকে। জনগণ নিজেদের মতাদর্শ, স্বার্থ ও পছন্দ অনুযায়ী দল নির্বাচন করতে পারে। এতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায় এবং নাগরিকদের সীমিত কয়েকটি দলের মধ্যেই পছন্দ করতে বাধ্য হতে হয় না।
২। বহুমতের প্রকাশ: সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল ও মতাদর্শের মানুষ থাকে। বহুদলীয় ব্যবস্থায় এসব ভিন্ন মতের প্রতিনিধিত্বকারী দল গড়ে উঠতে পারে। ফলে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর চিন্তা, দাবি ও স্বার্থ প্রকাশের অধিক সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৩। গণতন্ত্রের বিকাশ: একাধিক দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে শক্তিশালী করে। কোনো একটি দল সহজে স্থায়ীভাবে ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। নির্বাচনী প্রতিযোগিতা, বিরোধিতা ও বিকল্প নেতৃত্বের উপস্থিতি জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে সহায়ক হয়।
৪। স্বৈরাচার রোধ: বহুদলীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন দল ক্ষমতাসীন দলের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনা করে। একটি দলের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে অন্য দলগুলো তার বিরোধিতা করতে পারে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে এবং স্বৈরাচারী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যায়।
৫। সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব: ছোট জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষাগত বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ বহুদলীয় ব্যবস্থায় বেশি থাকে। তারা সংসদে নিজেদের সমস্যা ও দাবি তুলে ধরতে পারে। এতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নীতিনির্ধারণে প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পায়।
৬। জনমত প্রতিফলন: বহুদলীয় ব্যবস্থা সমাজের বৈচিত্র্যময় জনমতকে তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে। নির্বাচনের মাধ্যমে বিভিন্ন মতাদর্শের দল সংসদে আসায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে একক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বহু মতের উপস্থিতি থাকে। এতে নীতিনির্ধারণ আরও প্রতিনিধিত্বশীল হতে পারে।
৭। জোটের সংস্কৃতি: কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বিভিন্ন দলকে জোট গঠন করতে হয়। এতে আলোচনা, সমঝোতা ও পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের সমন্বয়ে সরকার গঠিত হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় বৃহত্তর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৮। নতুন নেতৃত্ব: বহুদলীয় ব্যবস্থায় নতুন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের বিকাশের সুযোগ বেশি থাকে। পুরোনো দল ব্যর্থ হলে নতুন দল বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে পারে। এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন চিন্তা, নতুন কর্মসূচি ও নতুন নেতৃত্ব প্রবেশ করে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গতিশীল থাকে।
৯। নীতির বৈচিত্র্য: বিভিন্ন দল অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্রনীতি ও সামাজিক বিষয়ে ভিন্ন নীতি উপস্থাপন করে। এতে জনগণ নীতিগত তুলনার সুযোগ পায় এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। এই প্রতিযোগিতা দলগুলোকে উন্নত ও জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে।
১০। জোটের অস্থিরতা: বহুদলীয় ব্যবস্থার বড় অসুবিধা হলো অনেক সময় কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। তখন জোট সরকার গঠন করতে হয়। জোটের শরিকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে সরকার ভেঙে যেতে পারে এবং ঘনঘন সরকার পরিবর্তনে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
১১। সিদ্ধান্তে বিলম্ব: জোট সরকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও আইন গ্রহণের আগে বিভিন্ন দলের সম্মতি প্রয়োজন হয়। একেক দলের দাবি ও স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দীর্ঘ আলোচনা করতে হয়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতেও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
১২। দলীয় বিভাজন: বহুদলীয় ব্যবস্থায় অতিরিক্ত দল গড়ে উঠলে রাজনৈতিক সমাজ ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হতে পারে। আদর্শ, অঞ্চল বা ব্যক্তি-কেন্দ্রিক বিভাজন জাতীয় রাজনীতিতে মেরুকরণ বাড়ায়। এতে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়।
১৩। ছোট দলের চাপ: জোট সরকারে ছোট দল কখনো কখনো সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা সীমিত জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পদ বা নীতিগত সুবিধার দাবি করতে পারে। এতে বৃহত্তর জনস্বার্থের পরিবর্তে ছোট দলের বিশেষ স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
১৪। দুর্বল সরকার: বহু দলের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল সরকার অনেক সময় শক্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। জোট ভেঙে যাওয়ার ভয় বা শরিক দলের বিরোধিতার কারণে সরকার কঠিন সংস্কার থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়ন দুর্বল হতে পারে।
১৫। নীতির অস্থিরতা: ঘনঘন সরকার বা জোট পরিবর্তন হলে রাষ্ট্রীয় নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। এক সরকার যে কর্মসূচি গ্রহণ করে, পরবর্তী সরকার তা বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারে। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
১৬। নির্বাচনী জটিলতা: বহু দল নির্বাচনে অংশ নিলে ভোটারদের জন্য দল, প্রার্থী ও নীতির মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনো জটিল হয়ে ওঠে। ভোট অনেক দলে বিভক্ত হলে কম জনসমর্থন পেয়েও কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারে। এতে প্রতিনিধিত্বের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
১৭। রাজনৈতিক দরকষাকষি: সরকার গঠন ও টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন দলের মধ্যে অতিরিক্ত দরকষাকষি হতে পারে। মন্ত্রীপদ, নীতি ও রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে সমঝোতা কখনো জনস্বার্থের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। এতে রাজনৈতিক নৈতিকতা, জবাবদিহি ও সরকারের প্রতি জনআস্থা দুর্বল হতে পারে।
উপসংহার: বহুদলীয় ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্বাধীনতা, বহুমতের প্রতিনিধিত্ব, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা ও সংখ্যালঘু স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে জোটের অস্থিরতা, সিদ্ধান্তে বিলম্ব ও অতিরিক্ত দলীয় বিভাজন এর প্রধান দুর্বলতা। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সমঝোতার সংস্কৃতি থাকলে বহুদলীয় ব্যবস্থা অধিক কার্যকর হতে পারে।