- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। একটি সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য শূন্য থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র সচল করা অত্যন্ত দুরুহ ছিল। ভৌগোলিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক নানা বাস্তবতার কারণে শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া নানাবিধ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আসছে।
রাষ্ট্রগঠনের মূল চ্যালেঞ্জসমূহ
১। ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো: ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের আমলাতান্ত্রিক এবং আইনি কাঠামো স্বাধীন বাংলাদেশেও অনেকাংশে অপরিবর্তিত থেকে যায়। এই পুরনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা স্বাধীন দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ ছিল না। ফলে একটি জনবান্ধব ও সেবামূলক প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের অভাব রাষ্ট্রগঠনের গতিকে মন্থর করে দেয়।
২। রাজনৈতিক অস্থিরতা: স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। বারবার সামরিক অভ্যুত্থান এবং অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা পরিবর্তন দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বারবার ব্যাহত হয়েছে। এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক নীতি নির্ধারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
৩। অর্থনৈতিক সংকট: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ভাঙাচোরা অর্থনীতি পুনর্গঠন করা ছিল শুরুর দিকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভৌত অবকাঠামো ধ্বংস হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ থাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র অভাব রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। দারিদ্র্য বিমোচন এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে হিমশিম খেতে হয়েছে। বৈদেশিক সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার পথকে কঠিন করে তোলে।
৪। প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী সংসদ, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীয়করণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। আইনি শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
৫। সংবিধানের ধারাবাহিকতা: ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের যে চার মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে তা বারবার সংশোধিত হয়েছে। সংবিধানের এই ঘনঘন পরিবর্তন রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব স্বার্থে সংবিধান ব্যবহারের প্রবণতা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করেছে। একটি সর্বজনীন ও স্থায়ী সাংবিধানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা আজও বড় চ্যালেঞ্জ।
৬। দুর্নীতি প্রতিরোধ: রাষ্ট্রগঠন ও জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতির বিস্তার রাষ্ট্রের সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার মান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির পেছনেও এই নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে।
৭। আইনের শাসন: বাংলাদেশে আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়শই দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থশক্তির কারণে সাধারণ নাগরিকরা অনেক সময় সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘসূত্রতা আইনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। একটি সাম্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
৮। আদর্শিক মেরুকরণ: স্বাধীনতার চেতনা এবং জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক বিভেদ রয়েছে। বাঙালি বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এই বিতর্ক সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীরভাবে বিভক্ত করে রেখেছে। এই মেরুকরণের কারণে জাতীয় স্বার্থের বড় বড় ইস্যুতে দলগুলো একমত হতে পারে না। ফলে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সংহত রাষ্ট্রীয় সত্তা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৯। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশ তিন দিক থেকে প্রতিবেশী ভারত দ্বারা বেষ্টিত এবং এক দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট নীতি নির্ধারণেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইকে আরও জটিল করে তোলে।
১০। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র: ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা লালন করার কারণে দেশের আমলাতন্ত্র অনেক সময়ই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে। মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়ন প্রশাসনিক পেশাদারিত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। একটি দক্ষ ও আধুনিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম বড় শর্ত।
১১। সামাজিক বৈষম্য: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন প্রকট হচ্ছে। সম্পদের সুষম বণ্টন না হওয়ায় সমাজের একটি বড় অংশ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকছে। এই সামাজিক বৈষম্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন না হলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে স্থায়ী শান্তি ও স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়।
১২। শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট: যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার অভাব দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। দেশের বর্তমান শিক্ষাক্রম তাত্ত্বিক বিষয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়ায় তা কর্মসংস্থানের বাজারের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। একই সাথে বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে সামাজিক বিভাজন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী শিক্ষানীতি ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব।
১৩। ধর্মীয় উগ্রবাদ: অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বিভিন্ন সময় ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অপতৎপরতা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সমাজকাঠামোকে দুর্বল করার অপপ্রয়াস চালায়। এটি মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে কঠোর আইনগত ও সামাজিক পদক্ষেপ নিতে হয়।
১৪। পররাষ্ট্র নীতি: পরাশক্তিগুলোর আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রকে সবসময় ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” এই নীতি বজায় রাখা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বেশ কঠিন। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সীমান্ত সমস্যা ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলো পররাষ্ট্র নীতির কার্যকারিতাকে বড় পরীক্ষায় ফেলেছে। বৈশ্বিক চাপ সামলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
১৫। রোহিঙ্গা সংকট: মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল বোঝা। এই সংকট দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে আছে। এই মানবিক সংকট রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর এক বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
১৬। জলবায়ু পরিবর্তন: ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে বিপন্ন করছে। এর ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছে, যা নগরায়ণকে অনিয়ন্ত্রিত করে তুলছে। জলবায়ুর এই বিপর্যয় মোকাবিলা করা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার লড়াই।
১৭। সুশাসনের অভাব: স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তাই হলো সুশাসনের মূল কথা, যা আমাদের রাষ্ট্রে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। তথ্য অধিকার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সুশাসনের অভাবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে এবং সরকারি সেবা প্রাপ্তি জটিল হয়। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
১৮। নির্বাচনী ব্যবস্থা: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার বৈধতার প্রধান উৎস হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্কের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্থায়ী পদ্ধতি গড়ে না ওঠায় প্রতি নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
উপসংহার: একটি আদর্শ কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। তবে টেকসই রাষ্ট্রগঠনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূরীকরণ, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দেশের এই অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো দূর করতে পারে। অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আগামী দিনের মূল লক্ষ্য।