- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো বৈদেশিক সাহায্য। যুদ্ধবিধ্বস্ত বা সম্পদ-স্বল্পতার দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জরুরি সংকট মোকাবিলায় এই সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এর পেছনে লুকিয়ে থাকে ভূরাজনীতি ও দাতাগোষ্ঠীর নানামুখী শর্ত, যা একটি দেশের স্বাবলম্বী হওয়ার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।
বৈদেশিক সাহায্যের প্রকারভেদ:
১। আর্থিক সাহায্য: এই ধরনের সাহায্য সাধারণত সরাসরি নগদ অর্থ বা বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে কোনো দেশকে প্রদান করা হয়। এটি সংশ্লিষ্ট দেশের বাজেট ঘাটতি পূরণ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং জরুরি আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সাধারণত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা দাতা দেশ এই অর্থ সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
২। কারিগরি সাহায্য: কোনো দেশের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রযুক্তি, জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ সেবা প্রদানকে কারিগরি সাহায্য বলা হয়। এর আওতায় অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের জনশক্তিকে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। উন্নত দেশগুলো থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে স্থানীয় প্রকল্প পরিচালনায় সরাসরি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী করতে এই সাহায্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
৩। পণ্য সাহায্য: এই সাহায্যের অধীনে দাতা দেশগুলো অনুন্নত দেশকে সরাসরি বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য বা শিল্প কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকে। এর মধ্যে খাদ্যশস্য, ওষুধ, সার, বীজ এবং বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি বা পরিবহন সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে এটি ভূমিকা রাখে। পণ্য আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটিয়ে এটি স্থানীয় অর্থনীতিকে সাময়িক স্বস্তি প্রদান করে থাকে।
৪। সামরিক সাহায্য: ভূরাজনৈতিক কৌশল ও নিরাপত্তার খাতিরে এক দেশ অন্য দেশকে যে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সহযোগিতা দেয়, তাই সামরিক সাহায্য। এর অধীনে সাধারণত উন্নত যুদ্ধাস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম, রাডার ব্যবস্থা সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অনেক সময় আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা বা কোনো নির্দিষ্ট জোটের শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দাতা দেশগুলো এই সহায়তা প্রদান করে। তবে এই ধরনের সাহায্য সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
৫। প্রকল্প সাহায্য: নির্দিষ্ট কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বা অবকাঠামো নির্মাণের উদ্দেশ্যে যে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়, তাকে প্রকল্প সাহায্য বলে। যেমন রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর নির্মাণ কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য এই তহবিল বরাদ্দ করা হয়। দাতা সংস্থাগুলো এই অর্থ সরাসরি প্রকল্পের খরচের সাথে মিলিয়ে ধাপে ধাপে ছাড় করে থাকে। ফলে এই সাহায্যের সুফল সরাসরি দৃশ্যমান হয় এবং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গঠনে এটি সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে।
৬। খাদ্য সাহায্য: কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা ফসলহানির ফলে খাদ্য সংকট দেখা দিলে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে খাদ্য সাহায্য পাঠানো হয়। এর মূল লক্ষ্য থাকে জরুরি ভিত্তিতে মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করা এবং পুষ্টিহীনতার হাত থেকে দুস্থ জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা। জাতিসংঘ বা বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশ গম, চাল, গুঁড়ো দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী অনুদান হিসেবে পাঠিয়ে থাকে। এটি মূলত একটি মানবিক সহায়তা, যা সাময়িকভাবে জীবন বাঁচাতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি।
বৈদেশিক সাহায্যের ইতিবাচক প্রভাব:
৭। অবকাঠামোগত উন্নয়ন: বৈদেশিক সাহায্যের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয় একটি দেশের যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতের ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নে। অনুন্নত দেশগুলোর পক্ষে নিজস্ব তহবিল দিয়ে বড় বড় সেতু, মহাসড়ক, গভীর সমুদ্রবন্দর বা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান এই বিশাল বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণ করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বৃদ্ধি করে। উন্নত অবকাঠামো দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটায় এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে মূল ভূমিকা পালন করে।
৮। দারিদ্র্য বিমোচন: প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং দারিদ্র্যের হার কমাতে বৈদেশিক সাহায্য সরাসরি অবদান রাখে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদারকরণ, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্পগুলো মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এর ফলে গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং তারা মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের সামর্থ্য লাভ করে। শিক্ষার আলো ও স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করে দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে ফেলে।
৯। প্রযুক্তির হস্তান্তর: উন্নত বিশ্ব থেকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তি অনুন্নত দেশগুলোতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্য একটি সেতু হিসেবে কাজ করে। এই সহায়তার মাধ্যমে কৃষি, শিল্প, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন কৌশল সহজেই আমদানিকৃত হয়। স্থানীয় প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানরা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শিখতে পারে। ফলস্বরূপ, দেশের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং দেশীয় শিল্প খাত বিশ্ববাজারের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করে।
১০। সংকট মোকাবিলা: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারি ও যুদ্ধের মতো চরম মানবিক সংকটে বৈদেশিক সাহায্য জীবনরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। হঠাৎ নেমে আসা এই বিপর্যয়গুলোর কারণে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, ওষুধ, অস্থায়ী বাসস্থান এবং পুনর্বাসনের জন্য নগদ অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসে। এই জরুরি সহায়তা না থাকলে আক্রান্ত দেশটির পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা অসম্ভব হতো।
১১। জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান বাড়াতে বৈদেশিক সাহায্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, স্যানিটেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে বিদেশি অর্থায়নে অসংখ্য প্রকল্প পরিচালিত হয়। এর ফলে সমাজে গড় আয়ু বৃদ্ধি পায় এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। উন্নত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সুবিধার কারণে নাগরিকরা একটি সুস্থ ও উৎপাদনশীল জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে, যা সামগ্রিক সামাজিক সূচককে সমৃদ্ধ করে।
১২। মানবসম্পদ গঠন: শিক্ষার প্রসার, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার মান বাড়াতে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো প্রচুর অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে থাকে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার আধুনিকায়ন, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এই সাহায্যের মাধ্যমেই সম্ভব হয়। এছাড়া, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপের ব্যবস্থা করার ফলে দেশ দক্ষ পেশাজীবী ও বিজ্ঞানী লাভ করে। একটি অনুন্নত জনসমষ্টিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করার মাধ্যমে দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুদৃঢ় ভিত্তি পায়।
বৈদেশিক সাহায্যের নেতিবাচক প্রভাব:
১৩। ঋণের ফাঁদ: বৈদেশিক সাহায্যের অন্যতম প্রধান কুফল হলো এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক ঋণের ফাঁদে ফেলে দেয়। অনেক সময় সাহায্যের বড় অংশই আসে কঠিন শর্তযুক্ত চড়া সুদের ঋণ হিসেবে, যা পরিশোধ করতে গিয়ে দেশের বাজেটের সিংহভাগ চলে যায়। প্রতি বছর ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে সরকারকে নতুন করে আবার ঋণ নিতে হয়, যা অর্থনীতিকে পঙ্গু করে। শেষ পর্যন্ত দেশ ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়ে এবং এর ফলে জাতীয় মুদ্রা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে।
১৪। সার্বভৌমত্ব খর্ব: বিদেশি সাহায্যের সাথে অনেক সময় দাতা দেশ বা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। এই শর্তগুলো মানতে গিয়ে গ্রহীতা দেশগুলোকে প্রায়শই তাদের নিজস্ব জাতীয় নীতি ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হতে হয়। এর ফলে দেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পায় এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা পরোক্ষভাবে খর্ব হয়। দাতা দেশগুলো নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য গ্রহীতা দেশের ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পায়।
১৫। পরনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি: নিয়মিত ও সহজলভ্য বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার ফলে একটি জাতির মধ্যে নিজস্ব সম্পদ আহরণ ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা হ্রাস পায়। সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি বা কর ব্যবস্থার সংস্কার না করে সবসময় বিদেশি অনুদান ও ঋণের ওপর ভরসা করতে শুরু করে। এই দীর্ঘস্থায়ী পরনির্ভরশীলতা জাতীয় অর্থনীতিকে অলস করে তোলে এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেতনাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেয়। কোনো কারণে সাহায্য বন্ধ হয়ে গেলে দেশের পুরো অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
১৬। দুর্নীতির বিস্তার: বৈদেশিক সাহায্য হিসেবে আসা বিপুল পরিমাণ অর্থের সঠিক তদারকি না থাকায় এটি অনেক সময় দুর্নীতির একটি বড় উৎসে পরিণত হয়। আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক নেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের যোগসাজশে এই সহায়তার একটি বিশাল অংশ অপচয় এবং আত্মসাৎ হয়ে থাকে। প্রকৃত সুবিধাভোগী বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সাহায্যের খুব সামান্য অংশই পৌঁছায়, যা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেয়। এই অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও তীব্র হয় এবং সুশাসনের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
১৭। কঠিন শর্তারোপ: দাতা সংস্থাগুলো সাহায্য দেওয়ার সময় এমন কিছু কঠোর ও অবাস্তব অর্থনৈতিক শর্ত দেয় যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়। যেমন, মুদ্রা অবমূল্যায়ন করা, ভর্তুকি তুলে নেওয়া বা বিদ্যুৎ-পানির দাম বাড়ানোর মতো শর্ত সাধারণ মানুষের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া, সাহায্যের টাকা দিয়ে দাতা দেশের নিজস্ব কনসালট্যান্ট নিয়োগ ও তাদের থেকেই পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা থাকে। এর ফলে সাহায্যের অর্থের একটি বড় অংশ আবার উন্নত দেশগুলোতেই ফেরত চলে যায় এবং স্থানীয় বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৮। দেশীয় শিল্পের ক্ষতি: অনেক সময় বৈদেশিক সাহায্যের অধীনে আসা সস্তা বা বিনামূল্যে পাওয়া পণ্য সামগ্রী দেশীয় বাজারের উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দেয়। বিশেষ করে খাদ্য ও কৃষি পণ্যের অবাধ আমদানির ফলে স্থানীয় কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পেতে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্প ও কৃষি খাত উৎসাহ হারিয়ে ফেলে এবং উৎপাদন কমে গিয়ে বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে। বিদেশি পণ্যের এই কৃত্রিম আধিপত্য দেশের নিজস্ব স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দিতে পারে।
শেষকথা: বৈদেশিক সাহায্য যেকোনো অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি দ্বিধাতু খড়গের মতো, যার যেমন সুফল রয়েছে তেমনি রয়েছে কুফল। এটি সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে এবং বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে সাহায্য করলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। একটি দেশের উচিত হবে সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল না হয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে শর্তহীন বা সহজ শর্তের সাহায্য গ্রহণ করা। সর্বোপরি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল বৈদেশিক সাহায্যের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন সম্ভব।