- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ব্রাহ্ম সমাজ হলো উনিশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, যা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু ধর্মের প্রচলিত কুসংস্কার দূর করে একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রসার ঘটানো। এই সমাজ রাজা রামমোহন রায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটি তৎকালীন সমাজে এক নতুন চিন্তাধারার সূচনা করে।
শাব্দিক অর্থ: ‘ব্রাহ্ম’ শব্দের অর্থ ‘ব্রহ্ম-উপাসক’ বা ‘যিনি ব্রহ্মের উপাসনা করেন’। ‘সমাজ’ শব্দের অর্থ গোষ্ঠী বা সংঘ। সুতরাং, ব্রাহ্ম সমাজ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ব্রহ্মের উপাসকদের সংঘ’।
ব্রাহ্ম সমাজ: ব্রাহ্ম সমাজ একটি ধর্মীয় এবং সামাজিক আন্দোলন যা মূলত একেশ্বরবাদ এবং যুক্তিবাদের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এটি হিন্দু ধর্মের বহু দেবদেবীর উপাসনা, মূর্তিপূজা এবং প্রচলিত কুসংস্কারের বিরোধিতা করে। ব্রাহ্ম সমাজ সকল ধর্মীয় গ্রন্থকে সমান চোখে দেখে এবং একটি সর্বজনীন ধর্মের আদর্শ প্রচার করে। এর মূলনীতি হলো ঈশ্বর এক এবং নিরাকার, এবং তাঁর উপাসনার জন্য কোনো মূর্তিপূজার প্রয়োজন নেই। ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যরা সামাজিক সমতা, নারী শিক্ষা এবং জাতিভেদ প্রথার বিলোপের মতো সংস্কারমূলক কাজের জন্য পরিচিত।
গবেষকগণ এবং ঐতিহাসিকগণ এই আন্দোলনকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে কিছু প্রাসঙ্গিক সংজ্ঞা দেওয়া হলো:-
১. অধ্যাপক সুমিত সরকার: ব্রাহ্ম সমাজ ছিল একটি প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলন যা প্রধানত বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রচলিত হিন্দু ধর্মের সংস্কার সাধন এবং একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা করা। (Brahmo Samaj was a protestant religious movement mainly confined to the Bengali bhadralok class. Its main objective was to reform orthodox Hinduism and establish monotheism.)
২. ড. রামচন্দ্র গুহ: ব্রাহ্ম সমাজ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা উনিশ শতকের নবজাগরণের পথ প্রশস্ত করেছিল। (Brahmo Samaj was not merely a religious sect but an intellectual and cultural movement that paved the way for the 19th-century renaissance.)
৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ব্রাহ্ম ধর্মকে একটি নতুন আধ্যাত্মিক পথের সন্ধান হিসেবে দেখেছিলেন, যা আনুষ্ঠানিকতা ও কুসংস্কারমুক্ত। তাঁর মতে, এটি ছিল মানবাত্মার এক মুক্ত ঘোষণা। (Rabindranath Tagore saw Brahmo religion as a new spiritual path free from rituals and superstitions. According to him, it was a declaration of the liberation of the human soul.)
৪. ডেভিড কফ (David Kopf): তিনি তার ‘The Brahmo Samaj and the Shaping of the Modern Indian Mind’ গ্রন্থে ব্রাহ্ম সমাজকে আধুনিক ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দিয়েছিল। (He described the Brahmo Samaj in his book ‘The Brahmo Samaj and the Shaping of the Modern Indian Mind’ as a focal point in modern Indian intellectual history that gave birth to a new social and political consciousness.)
৫. প্রশান্ত কুমার পাল: ব্রাহ্ম সমাজকে মূলত এক সামাজিক এবং ধর্মীয় সংস্কারের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মধ্যে নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহের মতো প্রগতিশীল ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে। (Prashanta Kumar Pal identified the Brahmo Samaj as a symbol of social and religious reform, which popularized progressive ideas like female education and widow remarriage among the middle-class Bengali society.)
৬. এম. আর. সেনগুপ্ত: ব্রাহ্ম সমাজকে একটি আন্দোলন হিসেবে দেখেন যা আধুনিক মূল্যবোধ যেমন স্বাধীনতা, সমতা, এবং যুক্তিবাদকে ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে স্থান দিয়েছে। (M. R. Sengupta viewed the Brahmo Samaj as a movement that placed modern values such as liberty, equality, and rationalism in a religious context.)
৭. প্রফেসর অমিয়কুমার সেন: ব্রাহ্ম সমাজকে এমন এক ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যা একদিকে হিন্দু ধর্মের প্রাচীন উপনিষদীয় ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল, এবং অন্যদিকে পশ্চিমা যুক্তিবাদ ও আধুনিক চিন্তাধারার সাথে তাকে সমন্বয় সাধন করতে সচেষ্ট ছিল। (Professor Amiya Kumar Sen defined the Brahmo Samaj as a religious and social movement that on one hand sought to restore the ancient Upanishadic tradition of Hinduism, and on the other hand tried to harmonize it with Western rationalism and modern thought.)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, ব্রাহ্ম সমাজ হলো একটি প্রগতিশীল ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন যা উনিশ শতকের ভারতে প্রচলিত কুসংস্কার, জাতিভেদ প্রথা এবং মূর্তিপূজার বিরোধিতা করে একেশ্বরবাদ, যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের ভিত্তিতে এক নতুন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
উপসংহার: ব্রাহ্ম সমাজ কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল ভারতীয় নবজাগরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি সনাতন ধর্মের কুসংস্কারগুলো দূর করে একটি নতুন আধ্যাত্মিক ও সামাজিক চেতনার জন্ম দিয়েছিল। রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের মতো ব্যক্তিত্বরা এই আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে যুক্তিবাদ, মানবতা এবং সমানাধিকারের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছিলেন। ব্রাহ্ম সমাজের আদর্শ আজও বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করে এবং সামাজিক প্রগতির পথে এটি এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
- প্রতিষ্ঠা: ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্ম সভা’ নামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ১৮৩০ সালে ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত হয়।
- বিভাগ: ১৮৬৬ সালে কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে তরুণ গোষ্ঠীর উদ্যোগে আদি ব্রাহ্ম সমাজ থেকে বিভাজন ঘটে এবং ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজ’ গঠিত হয়।
- গুরুত্ব: ব্রাহ্ম সমাজ নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ এবং অসবর্ণ বিবাহের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা ১৯ শতকের সামাজিক জাগরণকে ত্বরান্বিত করে।

