- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মহান সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা সাধারণত চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব নামে পরিচিত, ছিল মাও সে তুং কর্তৃক ১৯৬৬ সালে শুরু করা একটি বিশাল ও রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন, যা ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। এই বিপ্লবের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল চীনা সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করা, পুঁজিবাদী ও প্রথাগত উপাদানগুলোকে সমাজ থেকে দূর করা এবং পার্টির ভেতরে “সংশোধনবাদী” শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এই বিপ্লব আসলে কী ছিল এবং এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য কী কী।
মহান সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব কী?
মহান সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছিল চীনের ইতিহাসের অন্যতম বিপর্যয়ময় অধ্যায়, যা ১৯৬৬ সালের মে মাসে “১৬ মে বিজ্ঞপ্তি” নামক একটি দলিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে মাওয়ের মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় এক দশক ধরে চলতে থাকে। এই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও সমাজ থেকে পুঁজিবাদী, সামন্ততান্ত্রিক ও “সংশোধনবাদী” উপাদানগুলোকে দূর করা এবং মাওবাদের চিন্তাধারাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা। মাওয়ের মতে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরেও শ্রেণী সংগ্রাম থেমে থাকে না, বরং নতুন রূপ ধারণ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পার্টির ভেতরেই একটি “নতুন বুর্জোয়া শ্রেণী” তৈরি হয়েছে, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছে এবং সমাজতন্ত্রকে পুঁজিবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এই বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার ছিল “রেড গার্ড” নামক তরুণ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গঠিত আধাসামরিক বাহিনী, যাদের মাও সরাসরি উৎসাহিত করেন পার্টি নেতাদের, শিক্ষকদের, বুদ্ধিজীবীদের এবং “চারটি পুরনো জিনিস” (পুরনো চিন্তা, পুরনো সংস্কৃতি, পুরনো প্রথা ও পুরনো অভ্যাস) এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে। রেড গার্ডরা সারা দেশে তাণ্ডব চালায়—স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়, শিক্ষকদের গণপিটুনি দেওয়া হয়, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও শিল্পকর্ম ধ্বংস করা হয়, এবং লাখ লাখ মানুষকে “কাউন্টার-রেভোলিউশনারি” বা “পুঁজিবাদী পথগ্রাহী” বলে অভিযুক্ত করে নির্যাতন করা হয়। বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে মাও রেড গার্ডদের উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং তাদের “বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে রাখার” আহ্বান জানান।
মাওয়ের এই আন্দোলনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছিল। প্রথমত, ১৯৫৮-৬২ সালের “গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড” নামক অর্থনৈতিক কর্মসূচির ব্যর্থতার পর মাওয়ের নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল, এবং পার্টির ভেতরে লিউ শাওচি ও দেং শিয়াওপিংয়ের মতো নেতারা অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। মাও এই সংস্কারগুলোকে “পুঁজিবাদী পথ” হিসেবে দেখতেন এবং ভয় পেতেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো চীনেও “সংশোধনবাদ” ছড়িয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, মাও বিশ্বাস করতেন যে সমাজতন্ত্রের পরেও শ্রেণী সংগ্রাম চলতে থাকে এবং পার্টির ভেতরেই “পুঁজিবাদী পথগ্রাহী” নেতারা ক্ষমতা দখল করে নিতে পারে। তাই তিনি সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে, পার্টি নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করেন। তৃতীয়ত, মাও চেয়েছিলেন তাঁর চিন্তাধারা ও ব্যক্তিগত নেতৃত্বকে চীনা সমাজে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, যা “ব্যক্তিপূজা” বা “পার্সোনালিটি কাল্ট”-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলে চীনে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে এই সময়ে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষ নিহত হয় এবং কোটি কোটি মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়, অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে, এবং চীনা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ছিল বিপ্লবের সবচেয়ে সহিংস পর্যায়, যখন রেড গার্ডরা সারা দেশে তাণ্ডব চালায়। ১৯৬৯ সালের পর মাও রেড গার্ডদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামান এবং বিপ্লব কিছুটা শান্ত হয়, কিন্তু ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নির্যাতন চলতে থাকে। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে মাওয়ের মৃত্যুর পর অক্টোবরে “গ্যাং অফ ফোর” নামক মাওপন্থী নেতাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিপ্লব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৮১ সালে একটি সরকারি মূল্যায়নে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে “রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য সর্বনাশা” এবং “নেতৃত্বের ভুলের কারণে সংঘটিত অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা” হিসেবে ঘোষণা করে। তবে বর্তমান চীনে এই বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা নিষিদ্ধ এবং সরকার এটিকে একটি “সংবেদনশীল” বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। তবু এই বিপ্লবের প্রভাব চীনা সমাজে গভীরভাবে থেকে গেছে—একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষা ও জীবন ধ্বংস হয়েছে, পরিবার ভেঙে গেছে, এবং চীনা সংস্কৃতির অনেক মূল্যবান নিদর্শন হারিয়ে গেছে। দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সাল থেকে চীন যে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পথে এগিয়েছে, তা অনেকটা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়েই শুরু হয়েছিল।
উপসংহার: সব মিলিয়ে মহান সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছিল মাও সে তুংয়ের জীবনের শেষ বড় রাজনৈতিক আন্দোলন, যা তিনি শুরু করেছিলেন সমাজতন্ত্রকে রক্ষা ও পুঁজিবাদী পুনরুদ্ধার রোধ করার ঘোষিত লক্ষ্যে, কিন্তু বাস্তবে এটি পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও গণনির্যাতনে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই আন্দোলনে লাখ লাখ মানুষ নিহত ও নির্যাতনের শিকার হয়, চীনা অর্থনীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়, এবং সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। মাওয়ের মৃত্যুর পর চীনা সরকার এটিকে একটি “বিপর্যয়” হিসেবে স্বীকার করলেও বর্তমানে এই বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা নিষিদ্ধ, যা দেখায় যে এই বিপ্লবের প্রভাব চীনা রাজনীতি ও সমাজে এখনও গভীরভাবে থেকে গেছে।