- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রাককথা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক সংগ্রাম ছিল না, বরং তা বিশ্বরাজনীতির এক জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের উত্তপ্ত আবহে তৎকালীন বিশ্ব পরাশক্তিগুলো ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভিন্ন ভিন্ন পক্ষে অবস্থান নেয়। বাঙালির এই মহান মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎশক্তিগুলোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, যা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল।
পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা বিশ্লেষণ
১। সোভিয়েত ইউনিয়ন: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে ইতিবাচক ও অবিস্মরণীয়। তারা শুরু থেকেই পাকিস্তানের সামরিক জান্তার গণহত্যার তীব্র বিরোধিতা করে এবং বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন জানায়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোভিয়েত ইউনিয়নের এই দৃঢ় অবস্থান বাঙালি জাতিকে মানসিকভাবে বিপুল শক্তি জুগিয়েছিল এবং বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করেছিল।
২। ভেটো ক্ষমতা: জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যখনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব এনেছিল, তখনই সোভিয়েত ইউনিয়ন তা নস্যাৎ করে দেয়। তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পরপর তিনবার পাকিস্তানের পক্ষে আনা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় চরমভাবে বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত হতে পারত।
৩। ভারত-সোভিয়েত চুক্তি: ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঐতিহাসিক ২০ বছর মেয়াদি একটি মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিটি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের জন্য এক বিরাট কৌশলগত ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল। চুক্তির ফলে পাকিস্তানের পক্ষে অন্য কোনো পরাশক্তি সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার সাহস পায়নি, যা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।
৪। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি: মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতি ছিল সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের পক্ষে। ওয়াশিংটন তৎকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য পাকিস্তানকে একটি সেতু হিসেবে ব্যবহার করছিল। ফলে তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রেখেছিল।
৫। সপ্তম নৌবহর: যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে যখন পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে বঙ্গোপসাগরে তাদের পরমাণু অস্ত্রবাহী ‘সপ্তম নৌবহর’ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল মূলত ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভীত ও চাপের মুখে রাখার একটি অপকৌশল। তবে সোভিয়েত নৌবাহিনীর প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
৬। আমেরিকান জনমত: মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও আমেরিকার সাধারণ জনগণ, বুদ্ধিজীবী এবং গণমাধ্যম ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। নিউইয়র্ক টাইমসের মতো প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এবং বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পীদের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বাঙালির পক্ষে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল মানবিক জনমত তৈরি করেছিল।
৭। চীনের অবস্থান: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও চীন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। তারা বাঙালিদের ন্যায়সঙ্গত লড়াইকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে আখ্যায়িত করে এবং পাকিস্তানি জান্তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। চীন মূলত ভারতকে প্রতিহত করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে এই একতরফা নীতি গ্রহণ করেছিল।
৮। চীনা অস্ত্র: যুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে চীন পাকিস্তানকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে আসছিল। এই চীনা অস্ত্র ব্যবহার করেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্বিচারে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে চীন সরাসরি সীমান্ত দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকে।
৯। যুক্তরাজ্যের ভূমিকা: ব্রিটিশ সরকার সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে কোনো পক্ষের হয়ে প্রকাশ্য সামরিক অবস্থান না নিলেও তাদের পরোক্ষ সমর্থন ছিল বাংলাদেশের দিকে। লন্ডনে তৎকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের কূটনীতিকরা অত্যন্ত স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক প্রচারকাজ ও তহবিল সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছিলেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম, বিশেষ করে বিবিসি (BBC) বিশ্বস্ততার সাথে বাঙালিদের ওপর ঘটে যাওয়া গণহত্যার খবর প্রচার করেছিল।
১০। ফরাসি সমর্থন: ফ্রান্স বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাদের নৈতিক ও মানবিক সমর্থন ব্যক্ত করেছিল। ফরাসি সরকার পাকিস্তানি জান্তার গণহত্যার নিন্দা জানায় এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবিলম্বে রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদ দেয়। বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও সাহিত্যিক আন্দ্রে মারলো বাংলাদেশের পক্ষে লড়ার জন্য আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী দল গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা বিশ্ববাসীকে নাড়া দেয়।
১১। জাতিসংঘের বিতর্ক: মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের মূল মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বারবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে রুখে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো পরাশক্তিগুলোর বাধায় জাতিসংঘের সেই একপেশে প্রচেষ্টা সফল হতে পারেনি।
১২। মানবিক সাহায্য: আন্তর্জাতিক রেডক্রসসহ বিভিন্ন পরাশক্তির অরাজনৈতিক ও দাতব্য সংস্থাগুলো ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাধারণ নাগরিকরা বিপুল পরিমাণ অর্থ ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়ে শরণার্থীদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। সরকারের নীতি যাই হোক না কেন, বিশ্ব মানবতার এই সহায়তা বাঙালিদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছিল।
১৩। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে পরাশক্তিগুলো চালকের ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিল। একদিকে ছিল ভারত-সোভিয়েত অক্ষ, অন্যদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীন-পাকিস্তান অক্ষ, যা যুদ্ধকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
১৪। আঞ্চলিক ভারসাম্য: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। ভারতের প্রধান শত্রু পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলে মার্কিন ও চীনা অক্ষের বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় ঘটে। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মিত্র হিসেবে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে।
১৫। প্রবাসী কূটনীতি: পরাশক্তিগুলোর মন জয় করতে এবং বিশ্ব দরবারে স্বাধীনতার সপক্ষে স্বীকৃতি আদায়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কূটনীতি ছিল অত্যন্ত সফল। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাঙালি কূটনীতিকরা ব্রিটেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন। তাঁদের এই জোরদার প্রচারণার ফলেই পরাশক্তিগুলোর সরকার ও জনগণের ওপর বাংলাদেশের পক্ষে ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল।
১৬। চূড়ান্ত স্বীকৃতি: ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর অবস্থানের দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। ভারত ও ভুটানের পর একে একে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এমনকি ঘোর বিরোধী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
১৭। ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা ছিল দ্বিধাবিভক্ত এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট। সাধারণ বাঙালি জনতা নিজের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক লড়াই যুদ্ধের সময়কালকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সক্রিয় সমর্থন এবং মার্কিন-চীন অক্ষের বিরোধিতা বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অগ্নিপরীক্ষার জন্ম দিয়েছিল। বাঙালি জাতির অদম্য আত্মত্যাগ এবং বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরাশক্তির বলিষ্ঠ ভূমিকা বিজয়ের পথকে মসৃণ করেছিল। বিপরীত মেরুর পরাশক্তিগুলোর তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও সমস্ত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ভেদ করে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার উদয় ঘটেছিল।