- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রস্তাবনা: রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান—এই প্রশ্নটি দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ একে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন মনে করেন, আবার কেউ এর মানবকেন্দ্রিকতা ও অনিশ্চয়তার কারণে এর বৈজ্ঞানিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই বিতর্কের গভীরে যেতে হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পদ্ধতি, বিষয়বস্তু এবং ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে ‘বিজ্ঞান’ বলা যায় কিনা, এ নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মহলে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক:
- পদ্ধতিগত অধ্যয়ন: রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাজনৈতিক ঘটনা, প্রতিষ্ঠান এবং আচরণকে পদ্ধতিগত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিশ্লেষণ করে। এটি ডেটা সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কিছু অংশ ব্যবহার করে।
- সাধারণীকরণ ও ভবিষ্যদ্বাণী: প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো পুরোপুরি না হলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রবণতা বা আচরণের সাধারণীকরণ করতে পারেন এবং সীমিত পরিসরে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করেন (যেমন – নির্বাচনের ফলাফল)।
- বস্তুনিষ্ঠতা: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান গবেষণায় বস্তুনিষ্ঠতার ওপর জোর দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও পক্ষপাতিত্ব পরিহার করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
- অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণ: রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনেক গবেষণা অভিজ্ঞতামূলক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা পর্যবেক্ষণ, জরিপ বা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।
কারণ ও ফলাফল সম্পর্ক: প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো সরাসরি কারণ ও ফলাফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর কারণ ও প্রভাব বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন।
- মানব আচরণের জটিলতা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল বিষয়বস্তু হলো মানব আচরণ, যা অত্যন্ত জটিল, পরিবর্তনশীল এবং অপ্রত্যাশীত। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো স্থির ও সুনির্দিষ্ট সূত্র প্রয়োগ করা এখানে কঠিন।
- নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরীক্ষাগার নেই: প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিজস্ব কোনো পরীক্ষাগার নেই যেখানে সুনির্দিষ্ট শর্তাধীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রাকৃতিক নয়, বরং সামাজিক প্রেক্ষাপটে ঘটে।
- মূল্যবোধের প্রভাব: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যয়ন মূল্যবোধ নিরপেক্ষ হতে পারে না। একজন গবেষকের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ বা আদর্শ গবেষণার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
- ভবিষ্যদ্বাণীর সীমাবদ্ধতা: মানব আচরণ এবং ঐতিহাসিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করা প্রায় অসম্ভব।
- বস্তুনিষ্ঠতার অভাব: যদিও বস্তুনিষ্ঠতার চেষ্টা করা হয়, মানব সমাজের জটিলতায় এটি অর্জন করা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন।
উপসংহার: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে অনেকেই একটি ‘সামাজিক বিজ্ঞান’ হিসেবে দেখেন। এটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন অনুসরণ করতে না পারলেও, এর গবেষণার পদ্ধতিগততা, তথ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভরতা এবং বিশ্লেষণের প্রবণতা এটিকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি মানুষের রাজনৈতিক জীবনকে বোঝা এবং ব্যাখ্যার একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রচেষ্টা, যদিও এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বলা যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান একটি বিজ্ঞান, তবে তা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো নয়, বরং একটি ‘সামাজিক বিজ্ঞান’।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান একটি সামাজিক বিজ্ঞান, কিন্তু প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো যথার্থ নয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলা যায় কি না—এটি বিতর্কের বিষয়। এটি সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মানবিক আচরণ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও শাসনপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে। তবে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা পূর্বাভাসযোগ্যতা এখানে নেই, কারণ মানবিক আচরণ জটিল ও পরিবর্তনশীল। তবুও, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (যেমন পর্যবেক্ষণ, তত্ত্ব ও পরীক্ষণ) প্রয়োগের মাধ্যমে এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী অধ্যয়নক্ষেত্র।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
অ্যারিস্টটল-কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
এটি আন্তঃশাস্ত্রীয় (ইতিহাস, অর্থনীতি, দর্শন)।
পরিমাণগত ও গুণগত উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে।
ম্যাকিয়াভেলি, রুশো, মার্ক্স প্রমুখ এর বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

