- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক সময় দুটি শব্দ একই অর্থে ব্যবহৃত হলেও ধারণাগত দিক থেকে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মূলত ভয় ও সহিংসতা ব্যবহারের একটি কৌশল, অন্যদিকে জঙ্গিবাদ হলো উগ্র ও চরমপন্থী মতাদর্শ থেকে উদ্ভূত একটি প্রবণতা। উভয়ই সমাজে অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ- এর শাব্দিক অর্থ:- সন্ত্রাসবাদ শব্দটি ইংরেজি “Terrorism” শব্দের বাংলা রূপ। “Terror” অর্থ হলো ভয়, আতঙ্ক বা ভীতি এবং “ism” অর্থ হলো মতবাদ বা পদ্ধতি। অর্থাৎ ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের পদ্ধতিকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয়।
জঙ্গিবাদ- এর শাব্দিক অর্থ:- জঙ্গিবাদ শব্দটি ইংরেজি “Militancy” শব্দের বাংলা রূপ। “Militant” অর্থ হলো আক্রমণাত্মক, সক্রিয় বা চরম অবস্থান গ্রহণকারী এবং “ism” অর্থ হলো মতবাদ বা পদ্ধতি। অর্থাৎ কোনো উগ্র বা চরমপন্থী মতাদর্শের ভিত্তিতে আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণকে জঙ্গিবাদ বলা হয়।
সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের মধ্যে পার্থক্য:-
১। ধারণাগত পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদ হলো এমন একটি সহিংস পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাজনৈতিক, আদর্শিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে জঙ্গিবাদ হলো কোনো উগ্র বা চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস থেকে গড়ে ওঠা একটি মানসিকতা বা আন্দোলন।
২। উদ্দেশ্যের পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সহিংসতা ও আতঙ্কের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা। অন্যদিকে জঙ্গিবাদের উদ্দেশ্য হলো একটি বিশেষ চরমপন্থী বিশ্বাস, মতাদর্শ বা ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করা, যা অনেক সময় সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।
৩। প্রকৃতিগত পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদ মূলত একটি কার্যপদ্ধতি বা কৌশল, যেখানে ভয় সৃষ্টি ও সহিংসতা প্রধান মাধ্যম। জঙ্গিবাদ মূলত একটি মতাদর্শিক অবস্থান, যেখানে উগ্র চিন্তা ও চরম বিশ্বাস প্রধান ভূমিকা পালন করে।
৪। কার্যক্রমের পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদ সাধারণত বোমা হামলা, হত্যা, অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। জঙ্গিবাদ প্রচার, সংগঠন তৈরি, উগ্র মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া এবং চরমপন্থী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।
৫। বিস্তৃতির পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদ একটি নির্দিষ্ট সহিংস কর্মকাণ্ড বা কৌশলকে বোঝায়। অন্যদিকে জঙ্গিবাদ একটি বিস্তৃত ধারণা, যা ব্যক্তির চিন্তা, বিশ্বাস ও আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী সন্ত্রাসী পদ্ধতি গ্রহণ করলে তা সন্ত্রাসবাদের রূপ নিতে পারে।
৬। সম্পর্কের পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও তারা একই বিষয় নয়। জঙ্গিবাদী সংগঠন তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সন্ত্রাসবাদ ব্যবহার করতে পারে। তবে সব জঙ্গিবাদী ধারণা সরাসরি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পরিণত হয় না।
৭। প্রভাবের পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদ সরাসরি মানুষের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত করে এবং সমাজে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। জঙ্গিবাদ সমাজে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, উগ্রতা ও চরমপন্থী চিন্তার বিস্তার ঘটাতে পারে।
৮। নিয়ন্ত্রণের পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আইন প্রয়োগ, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় শিক্ষা, সচেতনতা, সহনশীলতা বৃদ্ধি ও উগ্র মতাদর্শ প্রতিরোধমূলক সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
৯। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসবাদকে সাধারণত সহিংস অপরাধ ও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা হয়। জঙ্গিবাদকে অনেক সময় উগ্রপন্থী বা চরমপন্থী মতাদর্শের প্রকাশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
১০। মূল পার্থক্য: সন্ত্রাসবাদের মূল বিষয় হলো ভয় সৃষ্টি ও সহিংসতার ব্যবহার, আর জঙ্গিবাদের মূল বিষয় হলো উগ্র ও চরমপন্থী মতাদর্শ। অর্থাৎ জঙ্গিবাদ একটি চিন্তাধারা বা প্রবণতা, আর সন্ত্রাসবাদ সেই চিন্তা বাস্তবায়নের একটি সহিংস পদ্ধতি হতে পারে।
উপসংহার: সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ উভয়ই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। তবে এদের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ যেখানে সহিংসতার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, সেখানে জঙ্গিবাদ উগ্র মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাই উভয় সমস্যা মোকাবিলায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ প্রয়োজন।