- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অপরিহার্য। আমাদের দেশে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই এককভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম। সঠিক আইনি ক্ষমতা ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল নির্বাচনের প্রকৃত সার্থকতা ও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়- স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট’- এর ব্যাখ্যা:
১। আইনি ক্ষমতা: একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনি ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। যখন কমিশন কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের আইন ও বিধিমালা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তখন নির্বাচনের স্বচ্ছতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। শক্তিশালী কমিশন যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলতে বাধ্য হয় এবং একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়।
২। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি: নির্বাচন কমিশনের প্রধান এবং অন্যান্য কমিশনারদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করাই তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে কমিশন কোনো দলের পক্ষ নিচ্ছে না, তখন পুরো প্রক্রিয়ার প্রতি সবার আস্থা তৈরি হয়। এই নিরপেক্ষতাই একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।
৩। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনের সময় দেশের সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা বাঞ্ছনীয়। পুলিশ, র্যাব এবং অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি বা দায়িত্ব বন্টনের পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনের হাতে থাকতে হবে। কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা পক্ষপাতিত্ব করেন, তবে কমিশন যেন তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। এই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হন।
৪। আর্থিক স্বাধীনতা: নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিশনের নিজস্ব এবং পর্যাপ্ত আর্থিক স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়ে বাজেট বরাদ্দ এবং অর্থ ব্যয়ের পূর্ণ ক্ষমতা থাকলে কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি কেনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই অর্থ সরাসরি ভূমিকা রাখে। আর্থিক সচ্ছলতা ও স্বাধীনতা কমিশনকে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
৫। মেধাভিত্তিক নিয়োগ: নির্বাচন কমিশনের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে মেধা ও সততাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ বন্ধ করে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। একটি দক্ষ জনবল যেকোনো জটিল পরিস্থিতি সহজেই মোকাবেলা করতে পারে এবং নির্ভুলভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। মেধাভিত্তিক নিয়োগের ফলে কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কাজের গুণগত মান অনেক বৃদ্ধি পায়।
৬। প্রযুক্তির ব্যবহার: আধুনিক যুগে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে উন্নত প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা অন্য কোনো স্বচ্ছ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হলে কারচুপি রোধ করা সহজ হয়। এছাড়া প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুততম সময়ে ভোটের ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব, যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি কমায়। শক্তিশালী কমিশন নিজেই এই প্রযুক্তিগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করার পূর্ণ সক্ষমতা ও অধিকার রাখে।
৭। কঠোর নজরদারি: ভোটগ্রহণের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করার মাধ্যমে বুথ দখল বা জাল ভোট বন্ধ করা সম্ভব। কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে কমিশন যেন তাৎক্ষণিকভাবে সেই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করার সাহস দেখায়। এই ধরনের কঠোর নজরদারি অপরাধীদের মনে ভয় তৈরি করে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা দেয়।
৮। আচরণবিধি প্রয়োগ: নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সমান আচরণবিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। ক্ষমতাসীন দল যেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা না পায়, তা কমিশনকে কঠোরভাবে দেখতে হবে। আইন ভঙ্গকারী যেকোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে জরিমানা বা প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের থাকা উচিত। আচরণবিধির সমপ্রয়োগ নিশ্চিত হলেই কেবল নির্বাচনের মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়।
৯। গণমাধ্যম স্বাধীনতা: নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহের অধিকার রক্ষা করা নির্বাচন কমিশনের একটি বড় দায়িত্ব। সাংবাদিকরা যেন কোনো বাধা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রের ভেতরের এবং বাইরের চিত্র সরাসরি জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। গণমাধ্যমের উপস্থিতি যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও কারচুপি প্রতিরোধে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে কাজ করে। কমিশন সাংবাদিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও পাসকার্ড প্রদানের মাধ্যমে এই কাজের পরিবেশ সহজ করে দেয়।
১০। ভোটার সচেতনতা: একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন কেবল ভোট গ্রহণই করে না, বরং ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করে। সাধারণ মানুষ যাতে ভয়ভীতিহীন পরিবেশে নিজের ভোট নিজে দিতে পারেন, সেজন্য বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালানো উচিত। নতুন তরুণ ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহিত করা এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে জানানো কমিশনের নিয়মিত কাজের অংশ। ভোটাররা সচেতন হলে কোনো অসাধু চক্র সহজেই নির্বাচনকে কলুষিত বা প্রভাবিত করতে পারে না।
১১। বিচারিক ক্ষমতা: নির্বাচনী অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচারের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সীমিত আকারে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ভোটকেন্দ্রের অপরাধের সাজা সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া উচিত। যখন অপরাধীরা দেখবে যে অপরাধ করার সাথে সাথেই শাস্তি পাওয়া যাচ্ছে, তখন তারা বিশৃঙ্খলা করতে সাহস পাবে না। এই বিচারিক ক্ষমতা কমিশনকে আরও বেশি শক্তিশালী ও মাঠ পর্যায়ে প্রভাবশালী করে তোলে।
১২। দলগুলোর নিবন্ধন: রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন এবং তাদের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কোনো দল যদি নিজেদের মধ্যে নিয়মিত কাউন্সিল বা গণতান্ত্রিক চর্চা না করে, তবে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। দলগুলোর আয়ের উৎস এবং ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত অডিট বা নিরীক্ষা করার ক্ষমতা কমিশনের থাকা দরকার। রাজনৈতিক দলগুলো স্বচ্ছ হলে দেশের সামগ্রিক নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে বাধ্য।
১৩। সীমানা নির্ধারণ: প্রতিটি সংসদীয় আসনের সীমানা সঠিকভাবে এবং বিতর্কহীনভাবে নির্ধারণ করা নির্বাচন কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জনসংখ্যা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে কোনো দলের সুবিধা না দিয়ে যৌক্তিকভাবে এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এতে প্রতিটি আসনের ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব সুষম হয় এবং কোনো প্রার্থীর প্রতি বৈষম্য তৈরি হয় না। একটি শক্তিশালী কমিশন কোনো রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই এই কাজটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে পারে।
১৪। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: নির্বাচন কমিশনকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী মানদণ্ড অনুসরণ করে সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আগমন সহজ করা এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি একটি দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি বিশ্ব দরবারে অনেক উজ্জ্বল করে তোলে। শক্তিশালী কমিশন দেশীয় আইনের পাশাপাশি বৈশ্বিক ভালো চর্চাগুলো নিজেদের পদ্ধতিতে যুক্ত করে।
১৫। অভিযোগ কেন্দ্র: নির্বাচনের সময় যেকোনো প্রার্থী বা সাধারণ ভোটারের অভিযোগ দ্রুত জমা ও নিষ্পত্তির জন্য একটি কেন্দ্রীয় সেল থাকতে হবে। আধুনিক অ্যাপ বা হটলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে কমিশনকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগকারী যেন বুঝতে পারেন যে তার সমস্যার প্রতি কমিশন অত্যন্ত আন্তরিক ও তৎপর রয়েছে। দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি করার এই প্রক্রিয়াটি কমিশনের প্রতি জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দেয়।
১৬। নিয়মতান্ত্রিক সংস্কার: যুগের প্রয়োজনে এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনী আইন ও নিয়মের নিয়মিত সংস্কার করা প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী কমিশন নিজেই আইন সভার কাছে প্রয়োজনীয় সংশোধনী বা নতুন বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব পাঠাতে পারে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিয়মকানুন পরিবর্তন না করলে পুরনো ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কমিশনের একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত।
১৭। সুশীল সমাজ: একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দেশের সুশীল সমাজ ও অংশীজনদের সাথে নিয়মিত সংলাপের আয়োজন করে থাকে। তাদের গঠনমূলক পরামর্শ এবং সমালোচনা কমিশনকে আরও বেশি দক্ষ ও দূরদর্শী হতে সাহায্য করে। সবার মতামত নিয়ে কাজ করলে কমিশনের কাজের প্রতি জাতীয় ঐকমত্য ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। সুশীল সমাজের সহযোগিতা কমিশনের নৈতিক শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে দেয়, যা যেকোনো সংকট মোকাবেলায় কাজে লাগে।
১৮। চূড়ান্ত ঘোষণা: নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্তভাবে ঘোষণা এবং গেজেট প্রকাশের সম্পূর্ণ ও একক একচ্ছত্র অধিকার নির্বাচন কমিশনের। কোনো পক্ষ যদি ফলাফল পরিবর্তন করতে চায় বা অনৈতিক চাপ দেয়, তবে কমিশনকে অটল থাকতে হবে। জনগণের দেওয়া প্রকৃত রায়ের প্রতিফলন ঘটানোই কমিশনের একমাত্র এবং পরম পবিত্র দায়িত্ব। এই চূড়ান্ত ঘোষণার সততার ওপরই একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।
শেষকথা: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাময়িক সংকটের সমাধান দিলেও তা স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সমাধান নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হলে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। একটি স্বাধীন, সৎ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন যদি সাহসের সাথে নিজের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, তবে যেকোনো সরকারের অধীনেই একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা পুরোপুরি সম্ভব।