- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: “স্থায়ী বিপ্লব“ (Permanent Revolution) হলো আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী একটি বিপ্লবী কৌশলগত তত্ত্ব। এটি মূলত আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের বিখ্যাত তাত্ত্বিক ও বলশেভিক নেতা লিওন ট্রটস্কি (Leon Trotsky) কর্তৃক বিকশিত ও পরিচিতি লাভ করে।
মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের সনাতন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ট্রটস্কি এই তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন।
সনাতন মার্কসবাদে মনে করা হতো—একটি অনগ্রসর বা অনুন্নত সমাজকে সমাজতন্ত্রে পৌঁছাতে হলে আগে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সামন্তবাদ দূর করতে হবে এবং ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ বিকাশ করতে হবে। এরপর দীর্ঘ সময় পর সর্বহারা বা শ্রমিক শ্রেণী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাবে।
ট্রটস্কির “স্থায়ী বিপ্লব” তত্ত্ব এই স্তরভিত্তিক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। তাঁর মতে:
- এক লাফে সমাজতন্ত্রের পথ: অনগ্রসর বা ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে (যেমন বিপ্লব-পূর্ব রাশিয়া) বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণী অত্যন্ত দুর্বল এবং তারা রাজনৈতিকভাবে ভীরু। তাই গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার দায়িত্ব বুর্জোয়াদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীকে কৃষকদের সঙ্গে জোট বেঁধে সেই বিপ্লবের নেতৃত্ব নিতে হবে।
- বিপ্লবের নিরবচ্ছিন্নতা: এই বিপ্লব গণতান্ত্রিক সংস্কারেই থেমে যাবে না। শ্রমিক শ্রেণী ক্ষমতা দখল করে অবিলম্বে সমাজতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে হাত দেবে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক বিপ্লব সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপ নেবে—মাঝখানে কোনো দীর্ঘ পুঁজিবাদী বিরতি থাকবে না।
- আন্তর্জাতিক বিস্তার: একটি অনগ্রসর দেশে বিপ্লব সফল হলেও তা কেবল নিজ দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকলে টিকে থাকতে পারবে না। সাম্রাজ্যবাদী বা পুঁজিবাদী দেশগুলোর আগ্রাসন থেকে বাঁচতে এই বিপ্লবকে ইউরোপ ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।
স্থায়ী বিপ্লব তত্ত্বের ৩টি প্রধান স্তম্ভ
স্তম্ভ | বিবরণ |
১. গণতান্ত্রিক থেকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর | গণতান্ত্রিক কাজ (যেমন সামন্তবাদ উচ্ছেদ, ভূমি সংস্কার) সম্পন্ন করতে করতেই বিপ্লব নিরবচ্ছিন্নভাবে সর্বহারার একনায়কত্ব ও সমাজতান্ত্রিক নীতি বাস্তবায়নে প্রবেশ করবে। |
২. সামাজিক কাঠামোর ধারাবাহিক পরিবর্তন | সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সমাজে দ্রুত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটতে থাকবে। পুরো সমাজব্যবস্থা এক স্থায়ী ও গতিশীল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। |
৩. বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক চরিত্র | সমাজতন্ত্র কোনো একক দেশে (Socialism in One Country) স্থায়ী হতে পারে না। জাতীয় বিপ্লব হলো আন্তর্জাতিক বিপ্লবের প্রথম ধাপ মাত্র; চূড়ান্ত মুক্তি বিশ্ব বিপ্লবের মাধ্যমেই সম্ভব। |
রাসায়নিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বের প্রয়োগ দেখা যায় ১৯১৭ সালের রাশিয়ার অক্টোবরে বলশেভিক বিপ্লবে। লেনিন ও ট্রটস্কি এই তত্ত্বের নীতি ব্যবহার করেই রাশিয়ায় শ্রমিকদের ক্ষমতায় আনেন।
তবে লেনিনের মৃত্যুর পর জোসেফ স্ট্যালিন ক্ষমতা দখল করলে স্ট্যালিনের “এক দেশে সমাজতন্ত্র” (Socialism in One Country) নীতির সাথে ট্রটস্কির “স্থায়ী বিপ্লব” তত্ত্বের চরম সংঘর্ষ ঘটে। স্ট্যালিনীয়রা ট্রটস্কির এই মতবাদকে বামপন্থী বিচ্যুতি ও দুঃসাহসবাদ হিসেবে আখ্যা দেয়, যা পরবর্তী সময়ে সাম্যবাদী শিবিরের অন্যতম প্রধান বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংক্ষেপে, স্থায়ী বিপ্লব হলো এমন এক অবিরত ও সীমাহীন বিপ্লবী প্রক্রিয়া—যা কোনো জাতীয় সীমান্তে বা সংস্কারের অর্ধপথে থেমে না গিয়ে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ উচ্ছেদ এবং সার্বিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ক্রমাগত চলতে থাকে।