- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, গণসংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ফল। এ সংগ্রামে আওয়ামী লীগ প্রধান নেতৃত্ব দিলেও ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও বিভিন্ন বামপন্থী দলও জনগণকে সংগঠিত ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব:
১। আওয়ামী লীগের উত্থান: ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রধান সংগঠনে পরিণত হয়। ভাষা, স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে দলটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২। ভাষা আন্দোলন: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, বামপন্থী দল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি বাঙালির স্বতন্ত্র জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে তোলে এবং ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করে।
৩। যুক্তফ্রন্ট গঠন: ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। তাদের ২১ দফা কর্মসূচি পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবি জোরালো করে এবং কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্য প্রকাশ করে।
৪। স্বায়ত্তশাসন দাবি: পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলে। বিশেষত আওয়ামী লীগ এই দাবিকে সুসংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করে। এর ফলে স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণা ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে শক্ত ভিত্তি লাভ করে।
৫। ছয় দফা আন্দোলন: ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এটি পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরে এবং বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তির সনদে পরিণত হয়। স্বাধীনতার আন্দোলনকে সুস্পষ্ট লক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে ছয় দফা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৬। ন্যাপের ভূমিকা: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, সামরিক শাসন ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে দলটি বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনা বিস্তারে অবদান রাখে।
৭। কমিউনিস্ট পার্টি: পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি ভাষা আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যেও এর নেতাকর্মীরা বাঙালির অধিকার ও জাতীয় মুক্তির পক্ষে সংগঠিত কার্যক্রম চালিয়ে স্বাধীনতার সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করেন।
৮। বামপন্থী আন্দোলন: বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি পাকিস্তানি শাসনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। তারা শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের আন্দোলনে যুক্ত করে। ফলে স্বাধীনতার দাবি শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দাবির সঙ্গেও যুক্ত হয়।
৯। আইয়ুববিরোধী সংগ্রাম: সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, বামপন্থী দল ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলন গড়ে তোলে। স্বৈরাচারবিরোধী এই সংগ্রাম জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি বাঙালির অনাস্থাকে আরও গভীর করে।
১০। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, বামপন্থী দল এবং ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন ধারার সম্মিলিত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের চাপে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি ঘটে। এতে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতার পথে আরও অগ্রসর হয়।
১১। সত্তরের নির্বাচন: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই গণরায় ছয় দফা ও বাঙালির স্বাধিকার দাবির পক্ষে স্পষ্ট সমর্থন দেয়। ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় স্বাধীনতার আন্দোলন আরও তীব্র হয়।
১২। অসহযোগ আন্দোলন: ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন কার্যত পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সরকারের কর্তৃত্ব অকার্যকর করে দেয়। সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যোগ দেয়। এর মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাথমিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি হয়।
১৩। মুজিবনগর সরকার: মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, প্রশাসনিক সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বৈধ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৪। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ: আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও বিভিন্ন বামপন্থী দলের নেতাকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তারা মুক্তিবাহিনী, গেরিলা কার্যক্রম, শরণার্থী সহায়তা ও জনসংগঠনে ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ মুক্তিযুদ্ধের গণভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করে।
১৫। আন্তর্জাতিক জনমত: বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে প্রচেষ্টা চালান। বিশেষত মুজিবনগর সরকার ও প্রবাসী রাজনৈতিক নেতারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
১৬। বিরোধী শক্তি: সব রাজনৈতিক দল স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না। তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের কিছু অংশ এবং কয়েকটি পাকিস্তানপন্থী দল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করে। ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল স্পষ্টভাবে বিপরীতমুখীও।
১৭। সম্মিলিত অবদান: বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের হাতে থাকলেও ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, বিভিন্ন বামপন্থী শক্তি ও গণতান্ত্রিক সংগঠনের অংশগ্রহণ সংগ্রামকে বিস্তৃত করে। তাদের সম্মিলিত আন্দোলন, জনসংগঠন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ স্বাধীনতার বিজয় অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্ব দিলেও ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য স্বাধীনতাপন্থী শক্তি সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছে। বিপরীতে কিছু পাকিস্তানপন্থী দল স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সামগ্রিকভাবে স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য ও জনগণের অংশগ্রহণই ১৯৭১ সালের বিজয়ের পথ সুগম করে।