- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: অগাস্ট কোঁতে, যাকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের জনক বলা হয়, সমাজের বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি অসাধারণ সূত্র দিয়েছিলেন, যার নাম ‘ত্রয়স্তর সূত্র’। এই সূত্রটি বলে যে, মানব জ্ঞান ও সমাজ তিনটি প্রধান স্তর পেরিয়ে বিকশিত হয়েছে। স্তরগুলো হলো: ধর্মতাত্ত্বিক, অধিবিদ্যক ও দৃষ্টবাদী।
ক. প্রথম স্তর – ধর্মতাত্ত্বিক (Theological Stage): এই স্তরে মানুষের জ্ঞান ও চিন্তাভাবনা ছিল মূলত ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তির ওপর নির্ভরশীল। কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ তার কারণ হিসেবে ঈশ্বর, দেবতা বা কোনো অদৃশ্য শক্তিকে দায়ী করত। যেমন, ফসল নষ্ট হলে ভাবা হতো যে কোনো দেবতার অভিশাপের কারণে এমন হয়েছে। এই স্তরে পুরোহিত বা ধর্মীয় নেতারা সমাজের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন।
খ. দ্বিতীয় স্তর – অধিবিদ্যক (Metaphysical Stage): এই স্তরটি ধর্মতাত্ত্বিক ও দৃষ্টবাদী স্তরের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করে। এখানে মানুষ অতিপ্রাকৃত শক্তির বদলে বিমূর্ত ধারণা বা সত্তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করে। যেমন, প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘প্রকৃতির নিয়ম’ বা ‘জীবনের সারমর্ম’-এর মতো ধারণার সাহায্য নেওয়া হতো। যদিও এই স্তরে যুক্তির ব্যবহার শুরু হয়, তবে তা পুরোপুরি বাস্তব বা বৈজ্ঞানিক ছিল না।
গ. তৃতীয় স্তর – দৃষ্টবাদী বা দৃষ্টবাদ (Positivistic Stage): এটি হলো জ্ঞানের বিকাশের চূড়ান্ত স্তর। এই স্তরে মানুষ সব ধরনের অতিপ্রাকৃত ও বিমূর্ত ধারণাকে বাদ দিয়ে কেবল পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যুক্তির ওপর ভিত্তি করে জ্ঞান অর্জন করে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, যেমন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান—এই স্তরেই বিকশিত হয়েছে। সমাজও এই স্তরে এসে বৈজ্ঞানিক নিয়মে পরিচালিত হতে শুরু করে। কোঁতের মতে, সমাজবিজ্ঞান এই দৃষ্টবাদী স্তরেরই একটি অংশ।
বিদ্র: বিস্তারিত আলোচনা: অগাস্ট কোঁতের এই সূত্রটি শুধু জ্ঞানের বিবর্তনই নয়, বরং সমাজের বিবর্তনেরও একটি চিত্র তুলে ধরে। কোঁতে বিশ্বাস করতেন যে, মানবজাতি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় জ্ঞান অর্জন করে এবং এই প্রক্রিয়াটিই সমাজের কাঠামো ও চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করে। তিনি ইতিহাসের বিভিন্ন যুগকে এই তিন স্তরের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। কোঁতের এই ধারণা সমাজের বিবর্তনে বিজ্ঞানের গুরুত্বকে তুলে ধরে এবং সমাজকে একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বিশ্লেষণের পথ খুলে দেয়। এটি একটি সরল কিন্তু শক্তিশালী কাঠামো যা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে মানব সমাজ ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও বাস্তবতার দিকে এগিয়েছে।
শেষ কথা: অগাস্ট কোঁতের ত্রয়স্তর সূত্র মানব সমাজের জ্ঞান ও চিন্তার বিবর্তনকে ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক বাস্তবতায় রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
প্রশ্নটি অগাস্ট কোঁতের ত্রয়স্তর সূত্রের মূলভাব এবং এর মাধ্যমে মানব সমাজের বিবর্তনের প্রক্রিয়াকে সহজভাবে জানতে চেয়েছে।
১৯ শতকে কোঁতে যখন এই সূত্র দেন, তখন এটি সমাজবিজ্ঞানে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ১৮৩৮ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কোর্স অব পজিটিভ ফিলোসফি’ প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি এই তত্ত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। ১৬ শতকের ইউরোপীয় রেনেসাঁস, যা যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কোঁতের অধিবিদ্যক স্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এরপর শিল্প বিপ্লব (১৭৬০-১৮৪০) দৃষ্টবাদী স্তরের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করে।

