- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রাক কথা:- মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করতে হলে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। এই নিয়মকানুনগুলো সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অপরিহার্য। যখন কোনো ব্যক্তি এই সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করে, তখন তাকে আমরা অপরাধ বলি। অন্যদিকে, যখন কোনো কাজ সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, আদর্শ বা প্রত্যাশার বাইরে চলে যায়, তখন তাকে বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও এই দুটি ধারণা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত, তবুও এদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। আসুন, সহজ ভাষায় এই পার্থক্যগুলো আলোচনা করা যাক।
১.আইনের লঙ্ঘন বনাম সামাজিক নিয়ম এর লঙ্ঘন:- অপরাধ মূলত রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর জন্য আইনি শাস্তি নির্ধারিত থাকে। অন্যদিকে, বিচ্যুতি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন না-ও হতে পারে। এটি সমাজের প্রথা, মূল্যবোধ বা রীতিনীতির পরিপন্থী আচরণ। এর জন্য সামাজিক তিরস্কার, নিন্দা বা बहिष्कारের মতো অনানুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।
২.শাস্তির প্রকৃতি:- অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে, যেমন – জরিমানা, কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড। বিচ্যুতির ক্ষেত্রে শাস্তির কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো নেই। সমাজ তার নিজস্ব রীতিনীতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের অনানুষ্ঠানিক শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে।
৩.গুরুত্ব ও তীব্রতা:- অপরাধ সাধারণত সমাজের জন্য অধিক ক্ষতিকর ও গুরুতর বলে বিবেচিত হয়। এটি ব্যক্তি, সম্পত্তি বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বিচ্যুতির প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর হতে পারে। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে কিছুটা ব্যাহত করলেও সরাসরি কোনো বড় ক্ষতির কারণ নাও হতে পারে।
৪.প্রমাণ ও প্রক্রিয়া:- অপরাধ প্রমাণ করার জন্য কঠোর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণ, তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে অপরাধীর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেই শাস্তি প্রদান করা হয়। বিচ্যুতির ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ বা আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। সমাজের মানুষ তাদের সাধারণ জ্ঞান ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে কোনো আচরণকে বিচ্যুত হিসেবে গণ্য করতে পারে।
৫.সর্বজনীনতা বনাম আপেক্ষিকতা:- কিছু অপরাধ যেমন – হত্যা, চুরি, ধর্ষণ – প্রায় সকল সমাজেই নিন্দনীয় এবং আইনত দণ্ডনীয়। এদের সর্বজনীন স্বীকৃতি রয়েছে। অন্যদিকে, বিচ্যুতির ধারণা সমাজ, সংস্কৃতি ও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। যা এক সমাজে বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য হয়, অন্য সমাজে তা স্বাভাবিক আচরণ হতে পারে।
৬.আনুষ্ঠানিক সংস্থা বনাম অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ:- অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও বিচারের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পুলিশ, আদালত, কারাগারের মতো আনুষ্ঠানিক সংস্থা বিদ্যমান। বিচ্যুতির ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় গোষ্ঠী, গণমাধ্যম এবং সমাজের সাধারণ মানুষ অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা পালন করে।
৭.লিখিত বনাম অলিখিত নিয়ম:- অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তি সাধারণত রাষ্ট্রীয় আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। বিচ্যুতির নিয়মকানুন பெரும்பாலும் অলিখিত এবং সমাজের মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস ও রীতিনীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়।
৮.ব্যক্তিগত বনাম সমষ্টিগত প্রতিক্রিয়া:- অপরাধের শিকার ব্যক্তি সাধারণত আইনি সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করে এবং রাষ্ট্র অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। :- বিচ্যুতির ক্ষেত্রে সমাজের মানুষ সম্মিলিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যেমন – সমালোচনা, গুজব ছড়ানো বা সামাজিকভাবে দূরে সরিয়ে রাখা।
৯.স্থায়িত্ব:- কোনো কাজ একবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হলে, যতক্ষণ না আইন পরিবর্তিত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হয়। :- বিচ্যুতির ধারণা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। এক সময়ের বিচ্যুত আচরণ পরবর্তীতে সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।
১০.উদ্দেশ্য:- অপরাধের পেছনে সাধারণত কোনো না কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা খারাপ অভিপ্রায় থাকে। :- বিচ্যুতির ক্ষেত্রে খারাপ উদ্দেশ্য থাকা অপরিহার্য নয়। অজ্ঞতা, অসাবধানতা বা ভিন্ন মূল্যবোধের কারণেও কোনো আচরণ বিচ্যুত হিসেবে গণ্য হতে পারে।
সর্বরশেষ:- অপরাধ ও বিচ্যুতি উভয়ই সমাজের নিয়ম ও প্রত্যাশা থেকে সরে আসা আচরণ। তবে এদের মধ্যেকার মূল পার্থক্য হলো আইনের লঙ্ঘন ও সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ। অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট শাস্তি বিদ্যমান, যেখানে বিচ্যুতি মূলত সামাজিক অনুশাসন ও অনানুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজের জন্য যেমন আইন মেনে চলা জরুরি, তেমনি সামাজিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াও অপরিহার্য। অপরাধ হলো রাষ্ট্রীয় আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যার জন্য আইনি শাস্তি নির্ধারিত থাকে। অন্যদিকে, বিচ্যুতি হলো সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও প্রত্যাশার বাইরে যাওয়া আচরণ, যার ফলস্বরূপ সামাজিক তিরস্কার বা बहिष्कारের মতো অনানুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।
অপরাধ হলো আইন ভঙ্গ করা, যা শাস্তিযোগ্য (যেমন: চুরি, খুন)। বিচ্যুতি হলো সমাজের নিয়ম ভঙ্গ করা, যা নিন্দনীয় কিন্তু দণ্ডনীয় নয় (যেমন: অপ্রচলিত পোশাক বা আচরণ)।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক অপরাধের হার প্রতি বছর ৩-৫% বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে ২০২১ সালের পুলিশ রিপোর্টে দেখা গেছে, ৬৫% অপরাধ অর্থনৈতিক কারণে ঘটে। অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের মতে, বিচ্যুতি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ২০২০ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৪০% মানুষ মনে করে বিচ্যুতি সময়ের সাথে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

