- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ব্যক্তিত্ব হলো মানুষের ভেতরের সেই অদৃশ্য কাঠামো, যা তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তোলে। আমাদের চিন্তা-ভাবনা, আবেগ, আচরণ এবং চারপাশের জগৎকে বোঝার নিজস্ব পদ্ধতি—এসবেরই সম্মিলিত প্রকাশ হলো ব্যক্তিত্ব। সহজ কথায়, কোনো পরিস্থিতিতে আমরা যেভাবে সাড়া দিই, নিজেদেরকে প্রকাশ করি এবং অন্যের সাথে মিশি, সেই অনন্য ধরণটিকেই ব্যক্তিত্ব বলা হয়। এটি আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের ভিত্তি।
শাব্দিক অর্থ
বাংলায় “ব্যক্তিত্ব” শব্দটি এসেছে “ব্যক্তি” থেকে, যার অর্থ কোনো স্বতন্ত্র মানুষ বা একক সত্তা। ইংরেজিতে এর প্রতিশব্দ হলো ‘Personality’, যা ল্যাটিন শব্দ ‘Persona’ থেকে এসেছে। প্রাচীন রোমে অভিনেতারা মঞ্চে যে মুখোশ (Mask) পরতেন, সেটিকে ‘Persona’ বলা হতো। এই মুখোশ যেমন একজন অভিনেতাকে একটি নির্দিষ্ট চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করতো, ঠিক তেমনি ব্যক্তিত্বও একজন মানুষকে তার নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয়ে সমাজের সামনে তুলে ধরে।
এর পরিচয়
ব্যক্তিত্ব হলো একজন ব্যক্তির চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য এবং আচরণের সেই ধরণ, যা সময়ের সাথে সাথে তুলনামূলকভাবে স্থায়ী এবং ধারাবাহিক থাকে। এটি কেবল একজন কেমন দেখতে বা তার বাহ্যিক আচরণ কী, তা নয়; বরং তার ভেতরের চালিকাশক্তি—যেমন তার আবেগ, উদ্দেশ্য, প্রেরণা, মূল্যবোধ এবং চিন্তা-পদ্ধতি—এসবের সামগ্রিক প্রতিফলন। আমাদের বংশগতি, পরিবেশ, শিক্ষা, এবং অভিজ্ঞতা—এই সবকিছু মিলেই একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়। এই ব্যক্তিত্বই নির্ধারণ করে একজন মানুষ কী ভাববে, কী অনুভব করবে এবং কীভাবে কাজ করবে।
ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা
গবেষকগণ সরাসরি একটি একক সংজ্ঞায় পৌঁছাতে না পারলেও, মনোবিজ্ঞানীরা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। নিচে কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী/মনীষীর দেওয়া কয়েকটি জনপ্রিয় সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১।গর্ডন অলপোর্ট (Gordon Allport): তিনি ব্যক্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে—”ব্যক্তির মধ্যে থাকা মনস্তাত্ত্বিক সেই গতিশীল সংগঠন, যা পরিবেশের সাথে তার অনন্য সমন্বয় নির্ধারণ করে।”
২।কার্ল রজার্স (Carl Rogers): তাঁর মতে, “ব্যক্তিত্ব হলো একটি স্বতন্ত্র এবং সুসংগঠিত, সামঞ্জস্যপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থা, যা ব্যক্তির জীবনধারণের কেন্দ্রে থাকে।”
৩।ই. জি. বোরিং (E. G. Boring): তিনি বলেছেন, “ব্যক্তিত্ব হলো যা একজন ব্যক্তি করতে পারে।” এই সংজ্ঞাটি মূলত ব্যক্তির আচরণের উপর জোর দেয়।
৪।বি. এফ. স্কিনার (B. F. Skinner): তাঁর আচরণবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, “ব্যক্তিত্ব হলো কেবল আচরণের একটি সেট বা ধরণ, যা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অভ্যাসের মাধ্যমে গঠিত হয়।”
৫।রবার্ট আর. হোয়াইট (Robert R. White): তাঁর মতে, “ব্যক্তিত্ব হলো ব্যক্তির এমন একটি সামগ্রিক ধরণ, যা তার মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলির একটি স্থিতিশীল সমন্বয়কে বোঝায়।”
৬।সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud): তিনি ব্যক্তিত্বকে ‘ইড (Id)’, ‘ইগো (Ego)’ এবং ‘সুপার-ইগো (Super-Ego)’ নামক তিনটি কাঠামোর জটিল মিথস্ক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
৭।হান্স আইসেঙ্ক (Hans Eysenck): তাঁর মতে, “ব্যক্তিত্ব হলো ব্যক্তির চরিত্র, মেজাজ, বুদ্ধিমত্তা এবং শারীরিক কাঠামোর কমবেশি স্থিতিশীল ও স্থায়ী সংগঠন, যা তার পরিবেশের সাথে তার অনন্য অভিযোজন ক্ষমতাকে নির্ধারণ করে।”
“ব্যক্তিত্ব হলো একজন ব্যক্তির চিন্তা, আবেগ এবং আচরণের সেই সুসংগঠিত এবং গতিশীল ধরণ, যা পরিবেশের সাথে তার মিথস্ক্রিয়া এবং তার স্বতন্ত্র জীবনধারাকে প্রতি মুহূর্তে প্রকাশ করে।”
উপসংহার: ক্তিত্ব কেবল একটি বৈশিষ্ট্য নয়, এটি একটি সজীব এবং গতিশীল প্রক্রিয়া। এটি আমাদের জন্মগত প্রবণতা এবং জীবনভর অর্জিত অভিজ্ঞতার এক চমৎকার মিশ্রণ। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক, এমনকি জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে এই ব্যক্তিত্বই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই, নিজের ব্যক্তিত্বকে জানা মানে নিজেকে এবং জীবনের পথকে আরও ভালোভাবে বোঝা। মূলত, ব্যক্তিত্ব হলো প্রতিটি মানুষের ভেতরের সেই অনন্য চিত্র, যা তাকে পৃথিবীতে একটি বিশেষ স্থান করে দেয়।

