- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রকাকথা: অপারেশন সার্চলাইট ছিল ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত ও পাশবিক গণহত্যা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের সকল সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা। এই অপারেশন ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংসতম গণহত্যার সূচনা, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দিয়েছিল এবং বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করে।
অপারেশন সার্চলাইট :
অপারেশন সার্চলাইট ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালির উপর চাপিয়ে দেওয়া এক নারকীয় সামরিক অভিযান। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে এই অভিযান শুরু করে। এই অপারেশনের প্রধান লক্ষ্য ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, পুলিশ, ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্য এবং সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সম্পূর্ণভাবে দমন করা।
এই অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারা। জেনারেল টিক্কা খান, রাও ফরমান আলী, খাদিম হোসেন রাজা-সহ আরও অনেকে এর মূল পরিকল্পনার সাথে জড়িত ছিলেন। অপারেশনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে ছাত্রদের হত্যা করা, পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে হামলা করে বাঙালি ইপিআর ও পুলিশ সদস্যদের নিরস্ত্র করা ও হত্যা করা, এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখল করে নেওয়া। একই সাথে সারা দেশের অন্যান্য শহরেও এই অভিযান চালানো হয়।
২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা শহরে ট্যাঙ্ক, কামান ও আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করে এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। ঘুমন্ত নিরীহ মানুষের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, অসংখ্য বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই গণহত্যায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। অপারেশন সার্চলাইটের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, এটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক শক্তির মাধ্যমে বাঙালিকে দমন করতে চেয়েছিল।
উপসংহার: অপারেশন সার্চলাইট ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি জঘন্যতম অপরাধ এবং মানবতাবিরোধী কর্মের এক কালো অধ্যায়। এই গণহত্যার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ২৫শে মার্চের কালরাত্রি বাঙালি জাতির জীবনে এক ভয়াবহ বিভীষিকা নিয়ে এলেও, এটিই ছিল বাঙালির প্রতিরোধের চূড়ান্ত স্পৃহা। এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করে এবং অবশেষে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনে সফল হয়। এই দিনটি আজও বাঙালি জাতির জীবনে শোক ও প্রতিবাদের প্রতীক।
অপারেশন সার্চলাইট হলো ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে পরিচালিত নৃশংস গণহত্যা।
অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে, এবং এর চূড়ান্ত অনুমোদন আসে ২৩শে মার্চ। এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক উপায়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ রাতে ঢাকা শহরে এই নৃশংস অভিযান শুরু হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ধারণা করা হয়, প্রথম কয়েক দিনেই এই অপারেশনে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়। এর ফলে প্রায় ১ কোটিরও বেশি বাঙালি ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই অপারেশন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন এবং এটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ।

